চাল বিতরনে ব্যাপক অনিয়ম: চেয়ারম্যান’র বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ

প্রকাশিত: ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২০
তরিকুল ইসলাম রতনঃ বরগুনা জেলা প্রতিনিধিঃ
বরগুনার নলটোনা ইউনিয়নে জেলেদের চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত ৪৮০ জন জেলেকে চাল না দেয়া, মৃত ও প্রবাসী জেলেদের নামে চাল বিতরণ এবং বরাদ্দের চেয়ে কম দিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী জেলেরা। জেলেদের অভিযোগ আমলে নিয়ে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তসাপেক্ষে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে জেলেরা উল্লেখ করেছেন, গত ২৯ মার্চ বরগুনা সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নে জেলেদের ভিজিএফ এর চাল বিতরণ করা হয়। নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক জেলেকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে দুই মাসে ৮০ কেজি চাল বিতরণ করার কথা। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে প্রত্যেক জেলেকে মাসে ৩০ কেজি করে দুই মাসে ৬০ কেজি চাল বিতরণ করে বাকী ২০ কেজি করে চাল আত্মসাৎ করেছেন চেযারম্যান হুমায়ুন কবীর। জেলেদের অভিযোগ, মাছ ধরার সাথে যুক্ত নয় এমন ব্যক্তিরা চাল পেলেও বঞ্চিত হয়েছেন তালিকায় থাকা ৪৮০ জন প্রকৃত জেলে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নলটোনা ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত জেলের সংখ্যা এক হাজার ৫৮০ জন। প্রত্যেক জেলের জন্য সরকারের তরফ থেকে ভিজিএফ এর আওতায় মাসে ৪০ কেজি করে চাল বরাদ্দ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে গত মাসের ২৯ তারিখ তালিকাভুক্ত এক হাজার ১০০ জন জেলের মাঝে দুই মাসের জন্য ৩০ কেজির দুইটি করে বস্তা অর্থাৎ ৬০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। বাকী ২০ কেজি করে মোট ২২ হাজার কেজি চাল বিতরণ করা হয়নি। এছাড়া, তালিকায় থাকা আরও ৪৮০ জন জেলেকে কোন চাল দেয়া হয়নি।
যার পরিমান ৩৮ হাজার ৪০০ কেজি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এবারে মোট ৬০ হাজার ৪০০ কেজি বা ৬০ মেট্টিক টনের বেশী চাল জেলেদেরকে না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর। অনুসন্ধানে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করা গেছে, আশ্চয্যজনকভাবে চাল পেয়েছেন তালিকায় থাকা ছয়জন মৃত ব্যক্তি ও একজন প্রবাসী। চাল বিতরণের মাস্টাররোলে তাদের টিপসহি রয়েছে।
চাল বিতরণের তালিকায় ১৬৪ নম্বর ক্রমিকে আজগরকাঠী গ্রামের মোঃ সেলিম, ১৭২ নম্বর ক্রমিকে একই গ্রামের মোঃ ছালাম, ৬৭৯ নম্বর ক্রমিকে আমতলা গ্রামের সুলতান, ৭২০ নম্বর ক্রমিকে গর্জনবুনিয়া গ্রামের সুলতান, ৮৫৬ নম্বর ক্রমিকে শিয়ালিয়া গ্রামের মোসাঃ সেলিনা এবং ৮৭৯ নম্বর ক্রমিকে একই গ্রামের আকাব্বরের নাম রয়েছে।
২৯ মার্চ চাল বিতরণের মাস্টাররোলে তাদের টিপসহি রয়েছে। কিন্তু আশ্চয্যজনক বিষয় হচ্ছে এ ছয়জনই ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ তালিকার ৬৭৯ নম্বর ক্রমিকে আমতলা গ্রামের সুলতান এবং ৭২০ নম্বর ক্রমিকে গর্জনবুনিয়া গ্রামের সুলতান আসলে একই ব্যক্তি। তালিকায় উভয় ক্রমিকে তার বাবার নাম আজিজ ফকির লেখা রয়েছে। এছাড়া তালিকার ১৮৭ নম্বর ক্রমিকে থাকা গোলবুনিয়া গ্রামের নাদের আলীর ছেলে আঃ রহিম প্রায় তিন বছর ধরে প্রবাসে রয়েছেন। চাল বিতরণের মাস্টাররোলে তারও টিপসহি রয়েছে। অনুসন্ধানকালে একাধিক ব্যক্তি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নলটোনা ইউনিয়নের গর্জনবুনিয়া গ্রামের জেলে আবদুল্লাহ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেয়ার কথা রয়েছে। ২৯ মার্চ চাল বিতরণের দিনে আমাকে কোন চাল দেয়া হয়নি। অনেক চেষ্টার পর ১২ এপ্রিল আমাকে ডেকে দুই মাসের জন্য ৬০ কেজি চাল দিয়েছেন চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর। জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় বর্তমানে আমরা নদীতে অন্য কোন মাছ ধরতে পারছি না। তার উপরে করোনার কারনে বিকল্প কর্মসংস্থানও নেই। এ অবস্থায় ২০ কেজি চাল কম পাওয়ায় সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে পরেছে। পরিবার পরিজন নিয়ে আমাদের না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়েছে।
গর্জনবুনিয়া এলাকার ছগির হোসেন, রাসেল, হানিফা ও নিশানবাড়িয়া গ্রামের কামালের নামও রয়েছে জেলে তালিকায়। এবার তারা কোন চাল পাননি। তারা বলেন, আমরা প্রায় ১০ বছর ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছি। বর্তমানে করোনার কারনে অন্য কোন কাজও করতে পারছি না। এ দুঃসময়ে আবার আমাদের জেলে সহায়তার চালও দেয়া হয়নি। এ অবস্থায় আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। তারা বলেন, আমাদের বাদ দিয়ে যাদেরকে চাল দেয়া হয়েছে তাদের অনেকেই প্রকৃত জেলে নয়। তারা চেয়ারম্যানের নিজস্ব লোক হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর বলেন, চাল বিতরণে কোন অনিয়ম হয়নি। মাসে ৪০ কেজি করে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক জেলেকে দুই মাসের জন্য ৮০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। আমার বিরোধী পক্ষ এসব মিথ্যা অভিযোগ করছে। তালিকায় মৃত ব্যক্তি ও প্রবাসীর নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, তালিকা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সদস্যরা করে থাকেন। সময়ের অভাবে বা ব্যস্ততার কারনে তালিকা পরীক্ষা করা হয় না। তবে পরবর্তীতে বিষয়টি পরীক্ষা করে দখো হবে।
এ ব্যাপারে বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, নলটোনা ইউনিয়নে জেলেদের মাঝে চাল বিতরণে অনিয়মের একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ তদন্তের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমানিত হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, বরগুনাসহ দেশের উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীতে ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে মাছ শিকারের ওপর গত ১ নভেম্বর থেতে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা আট মাসের নিষেধাজ্ঞা চলছে। মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞাকালীন নদ-নদীতে কোন জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেরা অনেকটা কর্মহীন হয়ে পড়ে। এসব কর্মহীন জেলেদের সরকারি খাদ্য সহায়তা হিসেবে ভিজিএফ এর আওতায় মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেয়ার কথা রয়েছে।

Sharing is caring!