ঘটনাটি মর্মান্তিক… সন্তানহারা মুক্তিযোদ্ধা পিতার আক্ষেপ…

প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ‘মৃত্যুর আগে মেয়েটি শেষ চিকিৎসাটুকুও পেল না। আমি ওকে ডাক্তার দেখাতে পারলাম না। বার বার অনুরোধ জানানোর পরেও ডাক্তার আসেনি। শেষ পর্যন্ত বিনা চিকিৎসাতেই ওর মৃত্যু হল। একজন বাবার জন্য এটা কত বড় কষ্টের তা বোঝানো যাবে না’।

অশ্রুসিক্ত নয়নে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন আর ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে নিদারুণ আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন পত্রিকা দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ এর প্রকাশক-সম্পাদক এবং শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী পরিষদের প্রবীণ সদস্য নূরুল আলম ফরিদ।

এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় ৭টায় তাঁর একমাত্র কন্যা ফারহানা সুলতানা ঊর্মিকে মুমূর্ষু অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মরহুমার নামাজে জানাযা শেষে মুসলিম গোরস্থানে দাদির কবরের পাশে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়।

এদিকে ফারহানা ঊর্মির মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যদের মাঝে শোকের মাতম বইছে। তাঁর মধ্যে সন্তানের শেষ বিদায়ের মুহূর্তে চিকিৎসা করাতে না পারার যন্ত্রণা তাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। শোক জানাতে আসা স্বজন, প্রতিবেশী এবং ঘনিষ্ঠজনদের সাথে এ নিয়ে শুধু আক্ষেপ করছেন আর কাঁদছেন তাঁর মুক্তিযোদ্ধা বাবা নূরুল আলম ফরিদসহ স্বজনরা।

নূরুল আলম ফরিদ বলেন, ‘আমার মেয়ে ঢাকাতে ছিল। সে ব্রেন স্ট্রোকের রোগী ছিল। সম্প্রতি তাকে পিত্রালয়ে নিয়ে আসা হয়। এখানে সে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা গ্রহণ করছিলো।

তিনি বলেন, ‘অসুস্থ হয়ে যাবার পরে ওই চিকিৎসককে অনেক অনুরোধ জানানো হয় বাসায় এসে ঊর্মির শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেয়ার জন্য। কিন্তু চিকিৎসক তাতে রাজি হননি। বরং তিনি ঊর্মিকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করতে বলেন। সেখানে ভর্তি করা হলে প্রয়োজনে তাকে যতবার খুশি দেখে আসবেন বলে জানানো হয়।

নূরুল আলম ফরিদ আরও বলেন, ‘ওই চিকিৎসক বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের চিকিৎসক। যে কারণে তিনি রোগীকে ওই হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা তিনি করেন নি। তিনি রোগীকে বেসরকারি ওই হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেন। কারণ তিনি ওই হাসপাতাল থেকে কমিশন পাবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘ওই চিকিৎসকের পরামর্শে বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল ঊর্মিকে। কিন্তু ওই হাসপাতাল তাকে গ্রহণ করেনি। করোনার ভয়ে রোগীর চিকিৎসা না দিয়ে তাকে শেবাচিম হাসপাতালে নিতে বলে। তাই বেসরকারি ওই হাসপাতাল থেকে তাকে শেবাচিম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে বিনা চিকিৎসাতেই মৃত্যু হয় ঊর্মির।

আক্ষেপ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে নুরুল আলম ফরিদ বলেন, ‘ওই চিকিৎসক যদি আমাকে শেবাচিম হাসপাতালের কথা বলতেন, তবে সাথে সাথেই ঊর্মিকে সেখানে নিয়ে ভর্তি করতে পারতাম। মৃত্যুর পূর্বে অন্তত সে কিছুটা হলেও চিকিৎসা পেত।

জানাগেছে, ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের হান্তাবাদে ৯ নম্বর সেক্টরের অভ্যর্থনা ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নূরুল আলম ফরিদ। সেখানে থেকেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র হিসেবে প্রকাশনা শুরু করেন দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ পত্রিকার। তাছাড়া তাঁর স্ত্রী সরকারি ব্রজমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। এমনকি মেয়ে ফারহানা নিজেও ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

দেশের সূর্য সন্তান একজন মুক্তিযোদ্ধার কন্যা হয়েও বিনা চিকিৎসায় তাঁর মৃত্যুর খবর সর্বমহলকে ক্ষুব্ধ করেছে। এমনকি করোনা পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তাঁরা নিন্দা জানিয়েছেন এমন চিকিৎসকদের প্রতি। যারা নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে অন্যকে বলি দিচ্ছেন।

Sharing is caring!