গ্রাহকের প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়ে উধাও ভুয়া এনজিও পিডিএফ

প্রকাশিত: ১২:০১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশাল নগরী ও বাবুগঞ্জের প্রায় পাঁচশত মানুষকে নিঃস্ব করে পালিয়ে গেলো পিপলস্ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ) নামের একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান। বরিশাল নগরী ও বাবুগঞ্জের ওই সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার পরিচয়দানকারী মো. রাজু আহমেদ ও আবুল কালামসহ তাদের সহযোগীরা।

অভিযোগ পেয়ে এই ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই অভিযান চালিয়ে এনজিওটির অফিস সহকারী পরিচয় দেওয়া দুই নারীকে গ্রেফতার করেছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ। এসময় পিডিএফ নামক ওই এনজিওটির বরিশাল অফিস থেকে তারা উদ্ধার করেছে বেশ কিছু কাগজপত্র। গ্রেফতারকৃতরা হলেন সালমা আক্তার ও মুক্তা বেগম। এই ঘটনায় একটি মামলাও হয়েছে।

অপরদিকে ঋণ দেওয়ার নামে ভুয়া এনজিও’র অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি নিয়ে বুধবার দুপুর ২টার দিকে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগীরা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী নথুল্লাবাদ এলাকার পোল্ট্রি ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান বলেন, ‘মহামারি করোনা ভাইরাস নিয়ে ব্যবসায়ীরা যখন মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন ঠিক তখনি অল্প টাকা সঞ্চয় রেখে মোটা অংকের লোনের কথা বলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র।

তিনি বলেন, চলতি মাসে বরিশাল নগরীর সিঅ্যান্ডবি রোডস্থ বৈদ্যপাড়ার মুখে একটি বাড়িতে তিন মাসের ভাড়া অগ্রিম দিয়ে পিপলস্ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামের ওই এনজিও প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানের সহকারী সায়েম ও কয়েকজন নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মোটা অংকের লোনের প্রলোভন দেখান।

মাসুদুর রহমান আরও বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বর্তমানে আমাদের অবস্থা আর্থিক ভাবে খারাপ। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোন সুযোগ সুবিধা পাইনি। হঠাৎ পিপলস্ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের লোক এসে আমাদের সেখানে বই করতে বলেন। তারা মোটরসাইকেলে করে নগরীর বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে যান। ১০ হাজার টাকা জমা দিলে এক লক্ষ টাকা লোন দেবেন বলে আমাদের বই করতে বলেন। আমরা সরল মনে তাদের বিশ্বাস করে বেশি লোনের আশায় ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় বইতে জমা দেই। আমি নিজেও ৫০ হাজার টাকা লোনের জন্য বুধবার অফিসে গিয়ে ১৩ হাজার টাকা জমা দেই। এভাবে নগরীর প্রায় তিনশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী টাকা জমা দিয়েছে। কিন্তু টাকা জমা দেওয়ার পর হঠাৎ করে জানতে পারি এটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান। পরে আমরা সেখানে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করলে ম্যানেজার রাজু আহম্মেদ অফিসে না এসে ফোন বন্ধ করে রাখেন।

এঘটনায় ভুক্তভোগীরা বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ রাতেই সেখানে অভিযান পরিচালনা করে কিছু কাগজপত্র ও ফাইল জব্দ করে। ওই এনজিও’র সহকারী দুই নারী কর্মীকে আটক করেছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের পলাশপুর এলাকার বাসিন্দা ভুক্তভোগী শুভ বলেন, আমি ব্যবসা করার জন্য তাদের কথায় ১০ হাজার টাকা দেই। তাও অনেক কষ্ট করে ধার করে দিয়েছি লোন পাব তাই। কিন্তু এখন আমার ব্যবসা তো দূরের কথা না খেয়ে থাকতে হবে।
এমন আরো একজন ভুক্তভোগী, নবগ্রাম রোডের সোনা মিয়ার পুল এলাকার বাসিন্দা মাকসুদুর রহমান। তিনি বলেন, করোনার সময়ে মানুষ মানুষকে সাহায্য না করে এমনভাবে প্রতারণা করবে তা বুঝতে পারিনাই।
অপরদিকে বরিশালের বাবুগঞ্জে লোন দেওয়ার কথা বলে মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আনুমানিক অর্ধকোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে পিডিএফ নামের ওই এনজিও সংস্থাটি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে উপজেলার খানপুরা জলিল মোল্লার বাড়ির একটি কক্ষ ভাড়া নেয় পিপলস্ ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামে এনজিও (এম আর এ রেজিঃ নং- ০৩৬৬৫ ০২৮৩৭ ০০৩৪২ ) নামের একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সদস্য সংগ্রহ ও লোন কার্যক্রম শুরু করে চক্রটি।

লোন দেওয়ার কথা বলে দুইশতাধিক মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় বাবদ ২০-৩০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করেন মাঠ কর্মী মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আবুল কালাম পরিচয়ে ০১৩০৮৬৪২২৩৫ নম্বর মোবাইল থেকে লোন প্রত্যাশিদের সাথে কথা বলেছে। ২২ জুলাই বুধবার সকালে লোন প্রত্যাশিরা অফিসে এসে জানতে পারেন ২১ জুলাই থেকে অফিসে কেউ আসে না, সঞ্চয়ের টাকা নিয়ে ফোন বন্ধ করে লাপাত্তা হয়ে গেছে।

প্রতারণার শিকার চাঁদপাশা এলাকার সুমন বলেন, আমার দোকানে ব্যবসায়ের জন্য ২ লক্ষ টাকা লোন দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। এরকম মাধবপাশা ইউনিয়নের ইকবাল, রহমতপুরের সাকিল প্রতারণার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছেন। ওই বাড়ির মালিক জলিল মোল্লার ভাই ইউপি সদস্য সুলতান মোল্লা বলেন, এনজিওটি আমার কাছে একটি রুম ভাড়া নেয়ার কথা বলে। তখন আমি ভাইয়ের কাছ থেকে একটি রুম নিয়ে দেই। আগামী ২৪ জুলাই শুক্রবার এনজিও’র ম্যানেজারের সাথে বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২১ জুলাই থেকে কেউ অফিসে আসছে না। সবার ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে লোন প্রত্যাশীরা লোনের আসায় অফিসে ভিড় করছেন বলে তিনি সত্যতা স্বীকার করেছেন।

Sharing is caring!