গৌরনদীতে ১ কিমি কাঁচা সড়কে ২০ বছর ধরে  জনদুর্ভোগ

প্রকাশিত: ৮:২২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২০

গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি ॥

দৈর্ঘ্যে প্রায় ৮কিলোমিটারের একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক। গত ৪০ বছর পূর্বে কাঁচামাটি দিয়ে নির্মিত ওই সড়কটির দু’প্রান্ত থেকে ৭ কিলোমিটার এলাকা কার্পেটিংয়ের মাধ্যমে পাকা করেছে এলজিইডি প্রায় ২০ বছর আগে। অথচ সড়কটির মাঝখানের প্রায় এক কিলোমিটার অংশ কাঁচা মাটির সড়ক হিসেবেই রয়ে গেছে আজ অবধি। ইতোমধ্যে ওই সড়কের দুই প্রান্তের পাকা ৭কিলোমিটার এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে কয়েক দফায় মেরামত বা সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু মাঝখানের কাঁচা মাটির ওই এক কিলোমিটার অংশকে পাকা করা হয়নি দীর্ঘ ২০ বছরেও।

ফলে জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটির উন্নয়নে সরকার লাখ লাখ টাকা ব্যয় করলেও বস্তুত তা এলাকাবাসী বা স্থানীয় জনগণের কোন কাজেই লাগেনি। হয়নি মূল পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, কমেনি জনদুর্ভোগও। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এখন নিরুপায় হয়ে তাদের নিজস্ব অর্থায়নে ও স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে সড়কটির মাঝখানের ওই এক কিলোমিটার কাঁচা মাটির অংশে ইট বিছিয়ে এইচবিবি দ্বারা উন্নয়ন করছেন। চরম অবহেলিত ওই সড়কটির নাম ভূরঘাটা-টরকী ভায়া কমলাপুর সড়ক। যার অবস্থান বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী ও খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের পূর্ব সীমান্ত জুড়ে। আর এর কাঁচা মটির অংশটুকুর অবস্থান বার্থী ইউনিয়নের বড়দুলালী গ্রাম এলাকায়।

জানাগেছে, প্রায় ৪০ বছর পূর্বে ১৯৮০/৮১ সালের সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী গৌরনদী উপজেলার উত্তর পূর্বকোন সীমান্তের ভূরঘাটা এলাকা থেকে উপজেলার পূর্ব সীমান্ত ধরে এ অঞ্চলের সর্ব বৃহৎ বাণিজ্য বন্দর টরকী বন্দর পর্যন্ত কাঁচা মাটির এ সড়কটি নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, উত্তর বরিশালের সর্ব বৃহৎ ওই বাণিজ্য বন্দরের সাথে সড়ক পথে উপজেলার উত্তর পূর্ব অঞ্চলের মানুষসহ পার্শ্ববর্তী কালকিনি উপজেলার একটি বৃহৎ অঞ্চলের মানুষের সংযোগ স্থাপন করা।

১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সড়কটিতে ইট বিছানোর মাধ্যমে এইচবিবি দ্বারা উন্নয়নের কাজ শুরু করে। ২০০১ সালে সড়কটির মাঝখানের এক কিলোমিটার বাকী রেখে উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ৭ কিলোমিটার এলাকা কার্পেটিং এর মাধ্যমে পাকা করা হয়। পরবর্তীতে একাধিক বার সড়কের দুই প্রান্তের পাকা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত বা সংস্কার করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সড়কটির মাঝখানের বড়দুলালী সরদার বাড়ির সামনে থেকে খাঞ্জাপুর ও বার্থী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী খালের বেইলি ব্রীজ পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার অংশ গত ২০ বছরেও পাকা বা কার্পেটিং করা হয়নি। ফলে গত ৪০ বছরেও হয়নি এ সড়ক নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন এবং কমেনি জনদুর্ভোগ। সড়কটির ওই কাঁচা অংশ উন্নয়নের জন্য ভুক্তভোগী এলাকাবাসীগণ গত ২০ বছরে বার্থী ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় রাজনীতিবিদ জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা এলজিইডি অফিসের কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন কিনারা করতে পারেননি।

গত মঙ্গলবার সরেজমিন সড়কটির চরম দুর্ভোগ প্রবণ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই সড়কটির কাঁচা মাটির ওই এক কিলোমিটার অংশে কাদা জমে একাকার হয়ে আছে। কোন কোন স্থানে হাঁটু সমান কাদা জমে আছে। ফলে সড়কের ওই অংশ জনচলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় চরম বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অবশেষে তাদের নিজেদের উদ্যোগে নিজস্ব অর্থায়ন ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গত ৫আগস্ট (বুধবার) থেকে সড়কটির পাকা অংশের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সংস্কারসহ কাঁচামাটির ওই এক কিলোমিটার অংশে ইট বিছিয়ে এইচবিবি দ্বারা উন্নয়ন কাজ শুরু করেছেন। বড়দুলালী গ্রামের ইতালী প্রবাসী মানবাধিকার সংগঠক মোঃ মিজানুর রহমান মুন্সীর নেতৃত্বে এলাকার ১০/১২ জন যুবক স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে এ কাজ করছেন।

মানবাধিকার সংগঠক মিজানুর রহমান মুন্সী অভিযোগ করে বলেন, সড়কটির কাঁচামাটির ওই এক কিলোমিটার অংশকে পাকা (কার্পেটিং) করার জন্য আমি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রকৌশলীসহ ও এলজিইডির কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, কিন্তু কেউ আমার অনুরোধ রাখেনি। এ কারণে আমিসহ এলাকার ধনাঢ্যরা মিলে এখন নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছি এবং এলাকার যুবকদের নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ইট বিছিয়ে এইচবিবি দ্বারা সড়কটির ওই অংশের উন্নয়ন করছি।

এই অংশটি পাকা হলে বড়দুলালী, বার্থী, কমলাপুর, খাঞ্জাপুর, ভূরঘাটা ও পার্শ্ববর্তী কালকিনি উপজেলা সদরসহ ওই উপজেলার ঝুরগাঁও, পাঙ্গাশীয়া, শিকারমঙ্গল এলাকার হাট বাজারগুলোর হাজার হাজার ব্যবসায়ী এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ মোকাম টরকী বন্দর থেকে অতি সহজে তাদের ব্যবসার পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে। সেই সাথে টরকী বন্দর থেকে এ অঞ্চলে পণ্য আনা-নেওয়ায় ব্যবহৃত থ্রি হুইলার যান বাহনগুলোকে ব্যস্ততম জাতীয় সড়ক, বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে উঠতে হবেনা। ফলে ওই মহাসড়কে দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। মহাসড়কের টরকী বাসস্ট্যান্ডের যানজট কমে যাওয়াসহ এর উত্তরের বাসস্ট্যান্ডগুলোতে কোন যানজট হবেনা। এ বিষয়টি কেন যে এলাকার রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাগণ বুঝছেন না, তা আমার বোধগম্য নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে গত ২০ বছরেও সড়কটির ওই এক কিলোমিটার অংশ পাকা হয়নি। স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত যুবকরা জানান, ইতালী প্রবাসী মিজানুর রহমান মুন্সী প্রথমে একাই সড়কটির ওই এক কিলোমিটার অংশ এইচবিবি দ্বারা উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। তার উদ্যোগ দেখে উৎসাহিত হয়ে এলাকার প্রবাসীরা ও ধনাঢ্য পরিবারগুলো অর্থ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন। এখন তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সড়কটির উন্নয়ন কাজ চলছে।

বার্থী ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহজাহান প্যাদা জানান, সড়কটির ওই অংশের উন্নয়নের জন্য আমি একাধিকবার উপজেলা পরিষদে প্রস্তাব দিয়ে প্রকল্প তৈরী করে দিয়েছি। এর পরও কেন এবং কি কারণে সড়কটির ওই অংশটুকু পাকা হচ্ছেনা বলতে পারছিনা।

গৌরনদী উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ অহিদুজ্জামান জানান, এলাকাবাসী ওই সড়ককে একটি সড়ক বলে দাবি করলেও আমাদের অফিসের কাগজপত্রে ওখানে দুটি সড়ক দেখানো হয়েছে। যার একটি খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের সড়ক, অন্যটি বার্থী ইউনিয়নের সড়ক। দুটি সড়কেরই আলাদা আইডি রয়েছে। যার একটির উন্নয়ন সম্পন্ন হলেও অন্যটির উন্নয়ন সমাপ্ত হয়নি। আপনারা যেটিকে মাঝের অংশ বলছেন সেটি মূলত বার্থী ইউনিয়নের অসম্পূর্ণ সড়কটির উত্তর প্রান্তের অংশ। এ বছরের উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে সড়কটির ওই অংশকে উন্নয়নের জন্য প্রকল্প তৈরী করে তা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। বিগত দিনে কি হয়েছে, ওই অংশের উন্নয়ন এতদিনে কেন হয়নি, তা আমার জানা নেই।

Sharing is caring!