গভীর রাতে মেসে হামলা : প্রতিবাদে ববি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ

প্রকাশিত: ১০:০৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১

স্টাফ রিপোর্টার ॥ গভীর রাতে মেসে ঢুকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের১১ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদসহ তিন দফা দাবিতে বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়ক টানা দশ ঘণ্টা অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ, কয়েকটি মাহেন্দ্র ও বাস ভাংচুর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

এর ফলে সকাল থেকে বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা-ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সকল রুটে যানবাহন চালাচল বন্ধ হয়ে যায়। শুধুমাত্র এ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরী প্রয়োজনের গাড়ি চলাচল করলেও বাকী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায় সড়কের দুই পাশে। এতে করে সড়কের দুই প্রান্তের প্রায় দশ কিলোমিটার জুড়ে সীমাহীন যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রী সাধারণকে। পরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুই দফা বৈঠকে দাবি আদায়ের আশ্বাসে বিকাল ৫টার দিকে অবরোধ তুলে নেন শিক্ষার্থীরা। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবি না-মানা হলে পুনরায় আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এর আগে বুধবার সকাল ৭টার দিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে পাথরবোঝাই ট্রাক, বাঁশ, ইটের স্তূপ ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন ববি শিক্ষার্থীরা।

 

 

এসময় তাদের হামলায় তারেক নামের শ্রমিক ও স্থানীয় পত্রিকার ইমরান নামের একজন ফটোগ্রাফার গুরুতর আহত হন। বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, ‘মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর রূপাতলী এলাকায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধর এবং অপর মেয়ে শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত করে বিআরটিসি বাস কাউন্টারের এক স্টাফ। এর প্রতিবাদে ওইদিন রূপাতলী এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত বিআরটিসি বাস কাউন্টার স্টাফ রফিককে আটক করা হলে দুই ঘণ্টা পরে অবরোধ তুলে নেয়া হয়।

 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মঙ্গলবার ওই আন্দোলনের নেতৃত্ব পর্যায়ে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহামুদুল হাসান তমাল। এ কারণে বুধবার রাত ১টার দিকে নগরীর রূপাতলী হাউজিং এলাকায় তমালের মেসে হামলা করে কতিপয় শ্রমিক। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পেরে সহপাঠীরা তমালকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। তখন ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে শ্রমিকরা।

 

এতে মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ সিদ্দিকী, রসায়ন বিভাগের এস.এম সোহানুর রহমান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আহসানুজ্জামান, গণিত বিভাগের ফজলুল হক রাজীব, সামাজ বিজ্ঞান বিভাগের আলীম সালেহী, বোটানি ও ক্রপ সাইন্সের আলী হাসান, বাংলা বিভাগের মো. রাজন হোসেন এবং মার্কেটিং বিভাগের মাহবুবুর রহমান, মাহাদী হাসান ইমন, মিরাজ হাওলাদার ও সজীব শেখ আহত হন। তাদেরকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

এ ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার সকাল ৭টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সম্মুখে বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে ওই রুটে সকাল থেকেই যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। যানবাহন বন্ধ থাকায় সড়কের দুই প্রান্তে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। এতে সড়কের রূপাতলী থেকে নথুল্লাবাদ এবং অপরপ্রান্ত দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় দশ কিলোমিটার জুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এদিকে, ‘সকাল ৮টার দিকে আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এসে আটকে পড়ে কুয়াকাটা এক্সপ্রেস নামের একটি যাত্রীবাহী বাস। এসময় ওই বাসটিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ ভাংচুর করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর সকাল সোয়া ১১টার দিকে বাসটিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন তারা।

 

অপরদিকে, সকাল থেকেই বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তবে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি পুলিশের দুটি জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সুব্রত কুমার দাস জানিয়েছেন, ‘রাতে সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তিনিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-কর্মকর্তাবৃন্দ। পরবর্তীতে আহত শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রত্যাহারের বিষয়ে সকাল সাড়ে ১১টায় শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন বৈঠক করে। এসময় শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। এ দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন এবং সড়ক অবরোধ চালিয়ে যাবার ঘোষণা দেন। এরপর দ্বিতীয় দফায় বেলা তিনটার দিকে পুনরায় বৈঠকে বসেন তারা। যা শেষ হয় বিকাল ৪টায়। এসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে উপাচার্য প্রফেসর ড. ছাদেকুল আরেফিন, সহকারী প্রক্টর সুপ্রভাত হালদার, শিক্ষক সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনার মোকতার হোসেন, গোয়েন্দা (ডিবি) শাখার উপ-কমিশনার মনজুর হোসেন উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি ববি শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান জানান, ‘দ্বিতীয় দফা বৈঠকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাসহ শিক্ষার্থীদের তিনটি দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসন। এ আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিকাল ৫টায় সড়ক অবরোধ তুলে নেয়াসহ আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।

 

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনার মোকতার হোসেন বলেন, ‘বৈঠকে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেছেন। দাবিগুলো হল- মঙ্গলবারের ঘটনায় দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার পদক্ষেপ গ্রহণ, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা এবং অনাবাসিক সকল শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানে ভূমিকা নেয়া। তাদের দাবিগুলো পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

অপরদিকে, বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন বলেন, ‘আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পূরণের আশ^াস দিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তাদের যে দাবি রয়েছে তাও বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। এর প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের পথ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।