কীর্তনখোলায় পানি বৃদ্ধির রেকর্ড : বরিশালজুড়ে জোয়ারের ক্ষতচিহ্ন

প্রকাশিত: ১:০৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২০

এম. বাপ্পি ॥

কীর্তনখোলায় মৌসুমের রেকর্ড জোয়ারের পানি বৃদ্ধিতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বরিশালে। নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় তলিয়ে গেছে নগরীর অপেক্ষাকৃত নিম্নাঞ্চল। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে পানির উচ্চতা আর জলমগ্ন হয়ে পড়ছে বরিশাল নগরীর নতুন নতুন এলাকা। ডুবে গেছে পাড়া-মহল্লার রাস্তাঘাট। এমনকি বাসা বাড়িতে পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে পানি। তবে সোমবার থেকে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে নগরীর মৃতপ্রায় খালগুলো। যেসব এলাকায় এখনও খালের অবশিষ্টাংশ টিকে রয়েছে, এমনসব এলাকায় এই ভোগান্তি বেশি।

তবে সবচেয়ে দুর্ভোগে রয়েছেন শহর রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন বাসিন্দারা। জলমগ্ন হয়ে পড়া এসব পরিবার রয়েছে নিদারুণ কষ্টে। এছাড়া খাল বা ড্রেনের পানি থেকে পানিবাহিত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে এ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পানি বৃদ্ধির রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে কীর্তনখোলায়। এ অবস্থায় আবহাওয়া অনুকূলে না যাওয়া পর্যন্ত পানিবন্দীদশা সহসাই কাটছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বরিশাল শহর রক্ষা বাঁধ সংলগ্ন স্টেডিয়াম কলোনি, কেডিসি, নামারচর, ভাটারখাল, পোর্টরোড, পলাশপুর, রসুলপুরের পাড়া-মহল্লা নদীতে জোয়ার আসার সাথেসাথেই জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। নতুন করে জলমগ্ন হচ্ছে সাগরদী, রুপাতলী হাউজিং, আলেকান্দা, কাউনিয়া, ভাটিখানার বসত বাড়ি-রাস্তাঘাট। যদিও ভাটার টানে আবার পানি নেমে যাচ্ছে দ্রুতই। তবে রেখে যাচ্ছে ভোগান্তি এবং ক্ষয়ক্ষতির ছাপ।

স্টেডিয়াম কলোনির বাসিন্দা শাহবানু, সালেহা বেগমসহ অন্যান্যরা জানান, বাড়িঘরে থাকার উপায় নেই। রান্না-বান্না সব চৌকির উপরই সারতে হচ্ছে। তারা কলোনিতে দীর্ঘদিন যাবত বাস করলেও জলমগ্ন হয়ে পড়ার এমন অবস্থা আগে কখনও দেখেননি। ভাটারখালের বাসিন্দা হকার হায়দার আলী জানান, গত ৩ দিন ধরে প্রত্যেকদিন দুই দফা অস্বাভাবিক জোয়ারের কবলে পড়ছেন। ঘর থেকে বাইরে বেরোতেও বেগ পেতে হচ্ছে। আয় রোজগারও বন্ধের পথে। দ্রুত এই পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে অর্থনৈতিকভাবে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা তার।

চিত্র : চাঁদমারি মাদ্রাসা

এদিকে পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখিত এলাকার রাস্তাঘাট। বিটুমিনের আবরণ সরে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে বালু-পাথরের আস্তরণ। হতশ্রী রূপ ধারণ করা এসব এলাকার সড়কগুলো সংস্কারে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাপ্টিস্ট মিশর রোড এলাকার বাসিন্দা মুনসুর আহমেদ জানান, গত ৩দিন যাবত জোয়ার আসার সাথে সাথেই সংলগ্ন খাল উপচে তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। গত জুলাই মাসেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে এলাকার মূল সড়কটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও ওই এলাকার জনপ্রতিনিধির এ বিষয়ে কোন মাথাব্যথা আছে বলে তার মনে হচ্ছে না। কারণ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তার গৃহীত কোন পদক্ষেপ যেমন দেখা যায়নি, তেমনি তাকে দেখা যায়নি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনেও।

এ বিষয়ে জানতে ১১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মজিবর রহমানের ব্যবহৃত ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জেরাল্ড অলিভার গুডা জানান, বিটুমিন দিয়ে তৈরি সড়কের মূল শত্রু হচ্ছে পানি। কার্পেটিং রাস্তার ক্ষেত্রেও একই বিষয় বিদ্যমান। তিনি বলেন, সড়কে পানি জমার স্থান থেকেই মূলত ‘পচনের’ সৃষ্টি হয়। আর সড়ক হারায় তার বাইন্ডিং ক্যাপাসিটি (ধরে রাখার শক্তি)। তাই যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে যত দ্রুত সম্ভব পানি অপসারণ এবং ভাঙা স্থান সংস্কারের বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন তিনি।

এদিকে জলমগ্ন এলাকায় পানিবাহিত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করেছেন সচেতন ব্যক্তিরা। জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সমীরণ চক্রবর্তী জানান, নদীর জোয়ারের পানি যেহেতু খাল বা ড্রেন দিয়ে শহরে প্রবেশ করছে, সেহেতু সেই পানি অবশ্যই দূষিত। কারণ অধিকাংশ বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজ লাইন এসব খাল বা ড্রেনের সাথে সংযুক্ত। তাই জোয়ারের এই পানি থেকে সহজেই রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষকরে ঘটতে পারে ডায়রিয়া বা খাদ্যে বিষক্রিয়ার মত ঘটনা। এ অবস্থায় সবাইকে বিশুদ্ধ পানি পান এবং খাবার আগে মাছ-মাংস-সবজি ভাল করে ধুয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গত ৩ দিনে কীর্তনখোলায় রেকর্ড ৪৫ সেন্টিমিটার পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে যা এ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সর্বশেষ গত জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ৩০ সেমি পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল কীর্তনখোলায়। বর্তমানে নদীর পানি বিপদসীমার ৩.০০ মিটারে অবস্থান করছে। যার স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার কথা ছিল ২.৫৫ মিটার। পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে বরিশাল বিভাগের অন্যান্য নদ-নদীতেও। অমাবস্যার জো’র এবং বৃষ্টির কারণে পানি বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে শীঘ্রই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে বলে জানিয়েছে পাউবো সূত্র।

Sharing is caring!