কলাপাড়ায় সবজি চাষীর উদ্ভাবন : পলিথিন-প্লাস্টিক পুড়িয়ে পেট্রোল-অকটেন-ডিজেল তৈরি

প্রকাশিত: ৬:৩৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০২০

মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া প্রতিনিধি ::

সবজি চাষী জাকির গাজী ফেলনা পলিথিন বিভিন্ন ধরনের খালি বোতলসহ সকল প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে একই সঙ্গে ডিজেল-পেট্রোল-অকটেনসহ গ্যাস তৈরিতে সফল হয়েছেন। এমনকি প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তৈরি পেট্রোল মোটরসাইকেল চালকদের কাছে বিক্রি করছেন। মাত্র ৭৫ টাকা লিটার দামে নিজের তৈরি পেট্রোল বিক্রি করছেন জাকির গাজী। বিষয়টি কুমিরমারা গ্রামের সকলের কাছে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

 

এ পদ্ধতির উদ্ভাবক জাকির হোসেন সংরক্ষণ করছেন ডিজেল। আর উৎপাদিত এলপি গ্যাস পেট্রোল-ডিজেল তৈরিকালে জ¦ালানি কাজে ব্যবহার করছেন। একেকবারে জাকির প্রায় আড়াই ঘণ্টায় তৈরি করছেন কমপক্ষে চার লিটার পেট্রোল, দুই লিটার অকটেন আর ১০ লিটার ডিজেল। তবে ডিজেল কেমিক্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে তরল করার পরে বাজারজাত করা যাবে বলে জাকিরের দাবি। কলাপাড়া-কুয়াকাটা মহাসড়কের পাখিমারা থেকে পূর্বদিকে গেলেই জাকির গাজীর এই উদ্ভাবন দেখার সুযোগ রয়েছে।

 

নিজের বাড়িতে আলকাতরার খালি লোহার ড্রামের সাহায্যে মুখ আটকে একটি ছিদ্রের সঙ্গে আধা ইঞ্চি ব্যাসের লোহার পাইপ লাইন করে প্রথমে সরাসরি গ্যাসের সিলিন্ডারের সঙ্গে সংযোগ দেয়া হয়েছে। সিলিন্ডার থেকে লোহার পাইপের সঙ্গে একটি প্লাস্টিকের বড় কন্টেইনার পর্যন্ত লাইন টানা হয়েছে। সেখান থেকে গ্যাসের চুলার পিভিসি পাইপের সাহায্যে দুটি লাইন দুটি ছোট কন্টেইনারে সংযোগ দেয়া হয়েছে। ছোট দুই কন্টেইনার থেকে দুটি লাইন গ্যাসের পিভিসি পাইপের লাইন টেনে মাথায় লোহার চিকন পাইপের সংযোগ দেয়া হয়েছে। প্রথমে প্লাস্টিক বর্জ্য ভরা হয় ড্রামের মধ্যে।

 

এরপরে সকল পাইপ লাইনের নাটসহ সকেট টাইট করে লাগানো হয়। যাতে জলীয় বাষ্প আকারে গ্যাস লিকেজ না হয়। কিংবা তরল লিকেজ হয়ে বের হতে না পারে। এরপরে ড্রামটি একটি চুলার ওপর কাত করে রাখা হয়। নিচ থেকে চুলার আগুনের তাপ দেয়া হয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ড্রামের ভিতরের পলিথিন প্রচন্ড তাপে গলতে শুরু করে এবং ভিতরে এলপি গ্যাস তৈরি হয়। প্রচণ্ড বেগে পাইপ লাইনে ড্রাম থেকে গ্যাস সিলিন্ডার এবং কন্টেইনার হয়ে পাইপ লাইনের মাথায় লোহার পাইপের মাধ্যমে নির্গত ওই গ্যাসে জ¦লতে থাকে চুলা। আস্তে আস্তে তাপের চাপে পলিথিনসহ ড্রামের সকল প্লাস্টিক বর্জ্য গলে তরল হয়ে তৈরি পেট্রোল জলীয়বাষ্প আকারে পাইপের মধ্য দিয়ে বের হয়ে গ্যাসের সিলিন্ডারে জমতে থাকে। সিলিন্ডার হয়ে প্লাস্টিকের বড় কন্টেইনারে গিয়ে জমে অকটেন।

 

তাপ যত বাড়ে তত বাড়ে গ্যাসের চাপ। ড্রামসহ গ্যাসের সিলিন্ডার গরম হয়ে যায়। পাইপ লাইনটিও গরম হয়ে ওঠে। তবে পাইপে পানি দিয়ে ঠাণ্ঠা রাখা হয়। ঘণ্টা দেড়েক পরে তৈরি এলপি গ্যাসের চাপ এতো বেড়ে যায় যে চুলায় জ্বালানি দেয়ার দরকার হয়না। উৎপাদিত এলপি গ্যাসেই জ্বলতে থাকে চুলা। যখন গ্যাস শেষ হয়ে যায় তখন বুঝতে পারেন যে উৎপাদন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এর পরে প্লাস্টিকের কন্টেইনার থেকে অকটেন। গ্যাসের সিলিন্টার খুলে পেট্রোল এবং চুলার ওপর থেকে ড্রামের মুখ খুলে সংগ্রহ করেন ডিজেল। জাকিরের দাবি যে পরিমাণ গ্যাস একেকবারে তৈরি হয় তা সিলিন্ডারজাত করতে পারলে দুই সিলিন্ডার ভরে যেত। রবিবার জাকিরের গ্রামের বাড়িতে জ্বালানি উৎপাদনের কর্ম দেখতে গেলে মানুষের ভিড় জমে যায়।

 

জাকির গাজী জানান, একেকবারে প্রায় ২৫-৩০ কেজি পলিথিনসহ প্লাস্টিক বর্জ্য লাগে। যা ৩০ টাকা কেজি দরে কিনে আনেন। ক্ষেত-খামারে ব্যবহার্য পলিথিনও ব্যবহার করছেন। ইউটিউবে দেখে এই প্রক্রিয়া তিনি শিখেছেন। আলকাতরার খালি একটি লোহার ড্রাম, একটি গ্যাসের খালি সিলিন্ডার, লোহার ও এলপি গ্যাসের পিভিসি পাইপ, ছোট-বড় তিনটি কন্টেইনার কিনতে হয়েছে। তাপ দিতে প্রত্যেক বারে প্রায় ২০ কেজি জ্বালানির দরকার হয়। পাইপ লাইনের সংযোগ সেট করতে হয়েছে। এজন্য সর্বমোট অন্তত ছয় হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্নে চারদিন সময় লেগেছে। চার সন্তানের জনক জাকির জানান, প্রথম প্রথম ঝুঁকি মনে হয়েছে। তবে পাইপ লাইন আরও বড় করতে হবে বলে জানালেন। দৈনিক তিন বার উৎপাদন করা সম্ভব বলেও দাবি জাকির হোসেনের। পেট্রোল-অকটেন সহহজভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন। তবে কেমিক্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করার পরে ডিজেল বাজারজাত করতে পারবেন বলেও জানান।

 

জাকির গাজী জানান, যেভাবে পলিথিনসহ প্লাস্টিক বর্জ্যে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে তাতে এই প্লান্টটি সফলভাবে চালু করলে অনেক বর্জ্য জ¦ালানি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার হতো। জাকিরের স্বপ্ন একটি কারখানা গড়ার। তবে এজন্য তিনি আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন সরকারের কাছে। জাকির আরও বলেন, ‘ পলিথিনসহ প্লাস্টিক বর্জ্যে কী পরিমান জ¦ালানি থাকে তাও বোঝা গেছে পেট্রোল-ডিজেল উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এসব পলিথিনে খাবার সামগ্রী মানুষ খাচ্ছে তাতে পেটে যাচ্ছে ক্ষতিকর কেমিক্যাল।’ জাকির আরও জানান, তিনি একজন পেশাদার সবজি চাষী। ১২ মাস সবজির আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এখন পলিথিনসহ প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়ে উৎপাদন করছেন পেট্রোল-অকটেন আর ডিজেল। যদিও প্রাথমিকভাবে সফল তিনি।

 

তবে একটি কারখানা করার আগ্রহ রয়েছে অদম্য এই মেধাবী মানুষটির। দৃঢ়চেতা মানসিকতার জাকির গাজীর আবেদন তাকে আর্থিক সহায়তা দিলে তিনি তার এই উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তির মাধ্যমে একটি ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইচ্ছা পোষণ করলেন। এসব কাজে স্ত্রী সাহিদা বেগম উদারভাবে সহায়তা করে যাচ্ছেন। জানালেন এ দম্পতি, এ পদ্ধতিতে পেট্রোলসহ জ¦ালানি তৈরির কাজ অব্যাহত রাখলে পরিবেশের ক্ষতিকর প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারিত হবে। এটি করলে বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানও করতে সক্ষম হবেন বলে প্রত্যাশা তাদের।