কলাপাড়ায় বৈধ-অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে একাট্টা সন্ত্রাসীরা

প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২০

পুলিশ কঠোর অবস্থানে

মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া প্রতিনিধি ॥

কলাপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এখন মূল টার্গেট নগদ অর্থসহ বিত্তবৈভব গড়ে তোলা। কে কোন দলের অনুসারি তা বিবেচ্য বিষয় নয় এদের কাছে। এরা সবাই একাট্টা। ইয়াবাসহ মাদক, সালিশ এ চক্রের প্রধান ব্যবসা। যদিও মাদকের কয়েকটি বড় চালান আটকের সফলতা রয়েছে র‌্যাব-পুলিশের। ফলে মাদক বাণিজ্য এখন অনেকটা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তবে মহাসড়কসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটের যানবাহনের চাঁদাবাজি চলছে ফ্রি-স্টাইলে চলছে। অবৈধ বালু উত্তোলন, সালিশ বাণিজ্য এচক্রের অন্যতম আয়ের উৎস্য, প্রধান টার্গেট। এছাড়া ৫০-৬০ বছর দখলে থাকা জমির মালিকদের কাগজপত্রে সমস্যা তৈরি করে আগে জমিতে সাইনবোর্ড দিয়ে ফয়সালার নামে মোটা অংক হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এদের টার্গেট এলাকার অনুপস্থিত মালিকদের জমি। প্রথমেই এরা বায়না দলিল করে। যেখানে কাগজে-কলমেস কোটি কোটি টাকা পরিশোধ দেখানো হয়। মানহীন ঠিকাদারি কাজ তো করছেই এ চক্র।

ধানখালীতে পায়রা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রসহ অপর বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণকেন্দ্রীক বালু, তেল, লেবার সরবরাহ নিয়ে একাট্টা চক্রটি। কে কোন দল কিংবা মতের তা বিবেচ্য বিষয় নয়। কে কতো বেশি ক্যাডারধারী কিংবা কমিশন দিতে পারবে তিনিই ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার সুযোগ পায়। এলক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ের তালিকাভুক্ত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মূল্যায়ন কিংবা ভাগ সম্মানজনকভাবে পোষানো হয়। ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা ব্যক্তি অনুসারি ভারি করতে আবার এদেরকে নিজের শিষ্য বানিয়ে পুষছেন। করোনাকালেও থেমে নেই এদেও রামরাজত্ব। বর্তমানে এসব কারণে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা অনেকটা অসহায় রয়েছেন। হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

অবস্থা এমন হয়েছে যে কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন দফতর পরিচালিত হয় অন্যদলের চিহ্নিত লোকজন দিয়ে। প্রশাসনও এদের সঙ্গে গা ভাসিয়ে চলছে। ফলে সরকারের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তৃণমূলের সাধারণ পেশাজীবী। এমনকি মোবাইল কোর্ট চলাকালে কলাপাড়ার ইউএনওসহ পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মূল হোতা পর্যন্ত এখনও গ্রেফতার হয়নি। অতি সম্প্রতি কলাপাড়া পৌর ছাত্রলীগের দুই গ্রæপের গরুর হাটের টোল কালেকশন নিয়ে পাখিমারায় মুখোমুখি সশস্ত্র অবস্থান নিয়েও মানুষ শঙ্কিত রয়েছে। যদিও পুলিশ দুই চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী গ্রেফতারে এখন অনেকটা স্বস্তি নেমে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধানখালী ইউনিয়নে এখন চলছে পায়রা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রিক একাধিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এসব উন্নয়ন কর্মকে ঘিরে বালু, ইট, সিমেন্ট, পাথর, জ¦ালানি তেল, শ্রমিকসহ বিভিন্ন মালামাল ও শ্রমিক সরবরাহের কাজ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এনিয়ে এসব সন্ত্রাসীদের একটি ঐক্যবদ্ধগ্রæপ রয়েছে। এরা আওয়ামী লীগ বিএনপি জামায়াত সব একমত, একদল হয়ে জোট বেধেছে। বিভিন্ন সময় সশস্ত্র মহড়া দেয়। পুলিশ বহুবার এদের চিহ্নিত কয়েকটি গ্রæপকে গ্রেফতার করেছে। এ গ্রæপের এখনও ১৮ জনের একটি তালিকা রয়েছে যারা একাধিক মামলার আসামি। এছাড়া পায়রা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রে হামলা-ভাংচুর, লুটপাটের মামলায় কেউ কেউ আসামি রয়েছে।

ধানখালী ইউনিয়নের তিনদিকে রয়েছে নদী। রাবনাবাদ ও টিয়াখালী এই দুই নদী তীরে ১০টির বেশি জেটি (ঘাট) করা হয়েছে। এই জেটি কেন্দ্রীক বড় চাঁদাবাজি চলে আসছে। এখান থেকে বালুসহ বিভিন্ন মালামাল লোড-আনলোড কেন্দ্রীক চাঁদার বড় অংশ পৌছে যায় এখানকার রাজনীতিক নিয়ন্ত্রক ক্যাডারদের হাতে। এই ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সম্প্রতি দিনের বেলা সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর জখম হন পটুয়াখালী জেলা যুবলীগের সাবেক নেতা শামীমুজ্জামান কাশেম। পুলিশ তাকে সন্ত্রাসীদের মারধরের পরে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসা করায়। এঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরছে। কলাপাড়া পৌরশহরসহ উপজেলার অন্তত ৩০টি স্পটে বিভিন্ন যানবাহন কেন্দ্রীক চাঁদাবাজি চলে আসছে। অধিকাংশ স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ করছে মাদকসহ বিভিন্ন মামলার আসামি ছাত্রলীগের নামধারী ক্যাডার।

এরা ছাত্র রাজনীতি বাদ দিয়ে এখন করছে অর্থের রাজনীতি। স্থবির হয়ে আছে সাংগঠনিক কর্ম। পুলিশি থানা মহিপুরে বালু ব্যবসার ভাগাভাগি নিয়ে রীতিমতো দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলছে দীর্ঘদিন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত কলাপাড়া থানার দেয়া তথ্যানুসারে কলাপাড়ায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী ছিল ১৮ জন। এখন কলাপাড়া কিংবা মহিপুর থানায় কতজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী রয়েছে তার সঠিক কোন তথ্য জানা যায়নি।

তবে একাধিক গোয়েন্দাসুত্রে জানা গেছে, সশস্ত্র সন্ত্রাসী এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নকারীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। একাধিক সচেতনমহল জানান, সামাজিক মুখোশের আড়ালে একটি চক্র এখন কলাপাড়ায় নির্বিঘ্নে বিভিন্ন অপকর্ম করে যাচ্ছে। এরা প্রশাসনের সঙ্গে কেউ কেউ আবার গাটছড়া বেধে ওঠাবসা করছে। সরকারের ধানক্রয়, কৃষক বাছাই, কৃষকের প্রণোদনা, করোনাকালীন ত্রান বিতরণ কর্মকান্ডে এরা কৌশলী হস্তক্ষেপ করছে। কলাপাড়া থানার ওসি খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সন্ত্রাসীদের তালিকা সবসময় আপডেট হয়। এটি করা হচ্ছে।

এছাড়া ধানখালীর শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ মোড়লসহ বঙ্গবন্ধু কলোনীর একটি কিশোর গ্যাং গ্রুপকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরপরও শীর্ষ সন্ত্রাসী আবু জাফর লালন, মামুন মোল্লা এবং সর্বশেষ চাঁদাবাজির দায়ে আল-আমিন ও মাসুম সরদারকে গ্রেফতার করে। মামলা হয়েছে পৌরছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়ের রানাসহ অনেকের নামে। পুলিশের দাবি সন্ত্রাসী যেই হোক পুলিশ তাকে ধরবে। আর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মহিপুর থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের তারা সবসময় নজরদারিতে রেখে গ্রেফতারে সচেষ্ট রয়েছেন। আর মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কোন আপোষ নেই। নির্মূল করা হবে বলে এ কর্মকর্তা জানালেন। আর বালু ব্যবসাকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা হচ্ছে। কিন্তু গডফাদাররা থাকছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

Sharing is caring!