কলাপাড়ায় বাড়িঘরসহ কৃষি জমির মালিকরা দখল সন্ত্রাস আতঙ্কে : রাত কাটে বিনিদ্র

প্রকাশিত: ৭:০৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া প্রতিনিধি ::

কলাপাড়ায় বাড়িঘরসহ কৃষি জমির মালিকরা এখন দখল আতঙ্কে রয়েছেন। ৫০-৬০ বছরের ভোগদখলীয় জমির কাগজপত্র ঠিক নেই অজুহাত তুলে কোন ধরনের আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করেই গায়ের জোরে সাইনবোর্ড লটকে দিয়ে চালানো হচ্ছে দখল। এখন জমির দখল সন্ত্রাসকে ঘিরে সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ করছে। আর এ চক্রের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিস্ময়কর উন্নয়নে যেখানে আওয়ামী লীগের ঘাঁটিখ্যাত কলাপাড়ায় জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকার কথা সেখানে শুধুমাত্র ভূমি দস্যুতার কারণে জনপ্রিয়তায় ধস নামার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারি দলের একটি সিন্ডিকেট স্থানীয় উপজেলা ও থানা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এখন ফ্রি-স্টাইলে যুগের পর যুগ ভোগদখলীয় জমিজমা হারাচ্ছে এই দখল সন্ত্রাসীদের কারণে।

ভূমি দস্যুরা মায়ানমার, কক্সবাজার থেকে রাখাইনদের কথিত ওয়ারিশ করিয়ে মার্মাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের সমন্বয়ে একটি ভয়াবহ জালিয়াতচক্র গড়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে অন্তত ৫০ একর জমিতে বায়নাসুত্রের সাইনবোর্ড দেয়ার অভিযোগে উঠেছে। এনিয়ে প্রতিকার পেতে ভুক্তভোগী মানুষ সংবাদ সম্মেলন করেছে। হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২২ আগস্ট টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়া গ্রামের চান মিয়া হাওলাদারের ছেলে আবু সাইদ হাওলাদার এক সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন তাঁদের ৫৫ বছরের দখলীয় বাড়ি-ঘর, পুকুর, কবরস্থান ও ফসলীয় ১৪ একর ২৫ শতক জমিতে যুবলীগ নেতা ও জেলা পরিষদ সদস্য আসলাম হাওলাদার, মিঠাগঞ্জের রুবেল সিকদার, লালুয়ার ফোরকান মৃধা, আউয়াল হাওলাদারসহ ভুয়া ওয়ারিশ বানিয়েছে। বর্তমানে তাদের চাষকৃত এ জমির ১১ একর ৮৩ শতক জমি দখলের কাগজপত্র তৈরি করেছে। ভূক্তভোগীরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু কোন প্রতিকার জোটেনি।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে চার যুগ আগে রাখাইনদের কাছ থেকে কেনা জমির বর্তমান ওয়ারিশ দেখানো হয়েছে মার্মা সম্প্রদায়ের একজনকে। তাও পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও বার্মা থেকে সংগ্রহ করে ভুয়া পাওয়ার অব এটর্নি তৈরি করা হয়েছে। ২০ আগস্ট এ জমির দখল করা নিয়ে সংঘাতে নয় জন জখম হয়। এখনও হাসপাতালে রয়েছে মো. রিয়াদ (১৮)। এ জমিতে বর্তমানে ৩২ জন ওয়ারিশ রয়েছে। আর পরিবারের সংখ্যা ১২টি। দখল আতঙ্কে রয়েছে কলাপাড়া পৌরসভার নয় নম্বর ওয়ার্ডের বাসীন্দা কুমারপট্টি অয়েলমিল মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. সাইফুদ্দিন সিকদার।

তিনি সপরিবারে ৩০ বছর আগের বসতভিটা দখল থেকে রক্ষার দাবিতে ১২ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় কলাপাড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। পাখিমারায় সংখ্যালঘু শোভা রানীর পরিবারের ওপর প্রকাশ্যে নারকীয় হামলা চালানো হয়েছে। শোভা রানীর দুই ছেলে, ছেলে বউসহ নিজে গুরুতর জখম হয়েছেন। এ ঘটনায় কলাপাড়া থানায় মামলা রয়েছে। এপরিবারের ৪০ বছরের পুরনো বাড়িঘরসহ জমি দখলে হামলা চালায় ওখানকার চিহ্নিত একটি সন্ত্রাসী চক্র।

মিঠাগঞ্জের মেলাপাড়ায় তেগাছিয়া মৌজার প্রায় নয় একর জমিতে দেয়া হয়েছে দখলের সাইনবোর্ড। প্রায় ৭০ বছরের ভোগদখলীয় জমিতে হঠাৎ দাবি করা দখলবাজদের সাইনবোর্ড দেখে বর্গাচাষীরা বিপাকে পড়েছেন। জমির মালিক ঢাকার সবুজবাগ থানার ৯০ নম্বর বাসাবো এলাকার বাসীন্দা গোলাম সরোয়ার সিকদার এ ঘটনার প্রতিকার চাইতে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে ১৯৫১ সালের ১১ জুলাই তাদের পূর্বপুরুষরা এ জমি চারটি দলিলের মাধ্যমে ক্রয় করে ভোগদখল করে আসছেন। কিন্তু হঠাৎ করে ৩০ মে ওই জমিতে গিয়ে ওই জমিতে বায়নাসূত্রে কেনা লেখা সংবলিত একটি সাইনবোর্ড দেখতে পান।

যেখানে জেলা পরিষদ সদস্য আসলাম হাওলাদারসহ ১২ জনের নাম রয়েছে। এরা সবাই রাজনৈতিক দলীয় লোক। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সবাই এখানে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। রুবেল সিকদার নামের এক ভূমি দস্যু এই ঘটনার হোতা বলে মানুষ জানায়। গ্রামের মানুষকে জিম্মি করে ক্যাডার ভাড়া করার কাজ করে আসছে রুবেল। বর্তমানে এ বিষয়টি নিয়ে গোটা এলাকার জমির মালিকদের মধ্যে দখল আতঙ্ক বিরাজ করছে। নীলগঞ্জের সংখ্যালঘু মাখন লাল বৈরাগীর বন্দোবস্ত পাওয়া জমিসহ চলাচলের রাস্তা দখল করে পুকুর ও সেমিপাকা ঘর তোলা হয়েছে। দিনেরাতে সমানে চলে এই দখল সন্ত্রাস। পড়শি রওশন আরা ও শাহআলম দম্পতি এমন দখল চালায়। ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে এখানকার সদ্য সাবেক তহশীলদারকে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু তহশিলদার জব্বার কোন সহায়তা করেনি।

মাখন লালের দোকানঘরটি পর্যন্ত চাল পাল্টাতে গিয়ে এক ধরনের বেদখল হয়ে গেছে। সেখানকার সুলতান মিয়া তার ছেলেদের নিয়ে কাজ বন্ধ কওে দিয়েছে। ৪০ বছরের দোকানঘরটি এখন চাল না থাকায় রোদে পুড়ছে আর বৃষ্টিতে ভিজে পচে যাচ্ছে। দরিদ্র এই মানুষটি এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও কোন প্রতিকার পায়নি। কুয়াকাটায় খানাবাদ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুল ইসলামের জমিতে তোলা হয়েছে অস্থায়ী চার খুটির ঘর। এ দখল ঠেকাতে মানুষটি ঘুরছেন পুলিশ প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে।

বালিয়াতলীর কোম্পানিপাড়ার দখল নিয়ে তো সর্বত্র চলছে আলোচনা সমালোচনা। কলাপাড়ায় এখন যার জমি রয়েছে সেই রয়েছেন দখল আতঙ্কে। সকল রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে এই দখলবাজচক্রটি দখল সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে। আর আওয়ামী লীগের দুর্গখ্যাত কলাপাড়ায় দলটির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। এ দখলবাজচক্রকে রুখতে না পারলে যে কোন সময় ঘটতে পারে অনাকাঙ্খিত খুন-খারাবি থেকে রক্তাক্ত সংঘাতের ঘটনা।

Sharing is caring!