করোনা প্রতিরোধে বিসিসিরও তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে

প্রকাশিত: 11:46 AM, March 29, 2020

শাকিল মাহমুদ ॥ মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবার শিকার বিশ^বাসী। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি বাংলাদেশেও আঘাত করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য মতে, বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৫। এছাড়া ভাইরাসটি থেকে সুস্থ হয়েছেন ১৫ জন। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে ব্যাপক তৎপর বাংলাদেশ সরকার। বরিশালেও এই তৎপরতা বিরাজমান। এরই মধ্যে বরিশালে রাস্তায় নেমেছে সেনাবাহিনী। তারা মানুষকে নানা ভাবে সচেতন করে চলছে। এছাড়া করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে জেলা প্রশাসক বিভিন্ন দৃশ্যমান কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছেন। বাজার মনিটরিং, প্রবাসীদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসক এর অধীন সকল কর্মকর্তা। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে পিছিয়ে নেই বরিশালের পুলিশ। এরই মধ্যে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সড়ক জীবাণুমুক্তকরণকল্পে ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে স্প্রে করেছে। মানুষকে সচেতন করতে এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে র‌্যাব-৮ ও জেলা পুলিশও কাজ করে যাচ্ছে। এদিকে করোনা প্রতিরোধে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে বরিশালের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ভাইরাসটি প্রতিরোধে ব্যক্তি উদ্যোগে এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে জনসচেতনতা কার্যক্রম ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী বিতরণ করছেন অনেকেই। যা প্রান্তিক মানুষের মনে জুগিয়েছে সাহস ও ভরসা। কিন্তু করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের উল্লেখযোগ্য কোন তৎপরতা চোখে পড়ছে না। যে কারণে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে নগরবাসীর মনে। ৩০টি ওয়ার্ড ও ২২৫টি মহল্লার ৫৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের তিনটি থানা নিয়ে সিটি কর্পোরেশন গঠিত। ২০১১ সালের আদমশুমারি বলছে প্রশাসনিক এই এলাকায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৭৮ জন মানুষ বসবাস করেন। আর কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বিগত ৯ বছরে জনসংখ্যা বেড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। কিন্তু পাঁচলাখ মানুষের মধ্যে অর্ধলাখ মানুষ বসবাস করেন নগরীর ৩৫টি বস্তিতে। বস্তির এ বাসিন্দারা এখনো জানেন না করোনা প্রতিরোধে তাদের কি করতে হবে। কেডিসির পাশের বস্তি বালুর মাঠ, ভাটার খাল, হিরন নগর, রসুলপুর, পলাশপুরের এসব বস্তি ঘুরে জানা যায় করোনা ভাইরাস সম্পর্কে তাদের জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোটায়। নগরীর দিনমজুর ইউনুস কাজ করছেন বটতলা এলাকার একটি নবনির্মিত ভবনে। ইউনুসের সাথে আরও কয়েকজন শ্রমিক কাজ করে যাচ্ছেন। কাজের ফাঁকে একটু বিরতি দিলে কথা হয় ইউনুসের সাথে। তিনি বলেন, হুনছি দেশে করুনা নামে কি যেন আইচে। হাত ধোয়া লাগবে। ঘরে থাকা লাগবে। মুই বদলা দেই। মোর কি অত বড়লোকি সাজে? কাম না হরলে খাওয়াইবে কেডা? তার কথায় সাথে তাল মিলালের শ্রমিক ছালাম,আবুল,ফারুক। নগরীর ২৬ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক করোনা সচেতনতায় তারা কি করবেন তা কিছুই জানায়নি। টেলিভিশনে দেখে যে জানার জেনেছেন তিনি। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক সেখানে হাত ধোয়ার জন্য পানির ট্যাংকি, সাবান, স্যানিটাইজার-কিছুই দেয়া হয়নি। একই এলাকার বাসিন্দা জয়নাল ইসলাম বলেন, আমাগো খবর নেবার সময় কি আর সিটি কর্পোরেশনের আছে! একবারও কেউ আইলো না আমারা কেমন আছি দেখতে। কি জানি কয় টিভিতে করেন্টাইনে না কিতে রাহে মানুষ। সিটি কর্পোরেশন মনে হয় হেইতে আছে। ২৩ নং ওয়ার্ড বাসিন্দা আম্বিয়া বেগম বলেন, ট্যাক্স নেওনের সময় মাইক ও আইন-আদালত লইয়া আয়। আর এহন বিপদে পড়ছি। কোন মনুগো চোহে দেহি নায়। এই নেতাগো বিচার আল্লায় করবে। নগরীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, নারী/পুরুষ কোন কাউন্সিলরই আসেননি তাদের খোঁজ নিতে, সচেতন করতে। যদিও নির্বাচনের আগে কাজ ছাড়াই কাউন্সিলররা এসে খোঁজ খবর নিতেন। আর এখন ক্রান্তিকালে নিম্নবিত্তের ঘরে কোন বার্তা পৌঁছাচ্ছেন না জনপ্রতিনিধিরা। কিন্ত আমাদের আশা ছিল আমরা যেমন বিভিন্ন ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিদের পাই, এই মহামারিতেও তাদের পাশে পাবো। এরই মাঝে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অবঃ) জাহিদ ফারুক, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের জেলা শাখার সদস্য সচিব ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী নগরবাসী ও বিভিন্ন বস্তিতে গিয়ে করোনা সুরক্ষায় মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করেছেন। এদিকে গতকাল শনিবার সিটি কর্পোরেশন এলাকার ১৬ জনকে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। পুরো বিভাগে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে ২৭৫৮ জনকে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের চেয়েও ভয়াবহ এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে কার্যকরী প্রচার-প্রচারণার প্রয়োজন। সিটি কর্পোরেশনের এই সময় নগরবাসীর পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল। নগরীতে যে সকল বস্তি এলাকা আছে এবং বস্তির বাইরে আবার কিছু এলাকা রয়েছে যেখানে সম্পূর্ণ নাগরিক সেবা পৌঁছেচ্ছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত ছিল সিটি কর্পোরেশনের। মূল শহরের বাইরে অথচ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো দরকার। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইতিমধ্যে কিছু স্থানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নগরীতে চালানো হয়েছে মাইকিং। বিতরণ করা হয়েছে লিফলেট। সর্বশেষ একটি সেল স্থাপন করা হয়েছে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর একে এম মুরতজা আবেদিন বলেন, করোনা ভাইরাসের বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন না করে মেয়র মহোদয়কে করেন। তার যারা এপিএস আছেন, পিএস আছেন তাদের কাছে প্রশ্ন করেন। আমার মতো নগণ্য একজন কাউন্সিলরকে এ প্রশ্ন করে লাভ কি! আমার ওয়ার্ডের করোনা সম্পর্কে আমি জানি না, আমি বাসার মধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছি। এলাকায় কি হয় এর জন্য সচিব আছেন, সুপার ভাইজার আছেন। তারা জানেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, আমার ওয়ার্ডে যথা সম্ভব জীবাণুুনাশক ওষুধ দেবার কাজ করছি। প্যানেল মেয়র হিসেবে আমার দায়িত্ব সব ওয়ার্ডের কিন্তু যেহেতু মেয়র মহোদয় আছেন আমি তো আর দায়িত্ব নিতে পারি না। এছাড়া আমি ২ নং প্যানেল মেয়র। আমি আমার ওয়ার্ডে কাজ করছি। নগরীর বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সরকার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে চাল, ডাল দিচ্ছে এবং কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো আমাদের সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে দেওয়া হয়নি। এসব জেলা প্রশাসক এর দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি ভালো বলতে পারবেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল গাজী নঈমুল হোসেন লিটু বলেন, সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্পটে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া করোনা ভাইরাস নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা চালিয়েছে। একটি সেল স্থাপন করা হয়েছে। আর কি করা যেতে পারে! বস্তি এলাকার লোকজনদের নিয়ে সে সমস্ত ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আমরা জীবাণুনাশক ওষুধের ব্যবস্থা করেছি। বিভিন্ন অভিযোগের কথা বলে হলে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন থেকে তো অনেক কিছু বিলি করা হচ্ছে না বিষয়টি বুঝতে হবে! আমরা খাবার দিচ্ছি না। আমরা মাস্ক দিচ্ছি না সেই ভাবে। মাস্ক ব্যবহারের উপরে অনেক বিষয় আছে আমরা সেগুলো মাথায় রেখে এ বিষয়গুলো করছি না। আমার পাবলিক অ্যাওয়ারের উপরে কাজ করছি এবং আমার মনে হয় এর একটি সুফল আমরা পেতে শুরু করেছি। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেডিকেল অফিসার ডাঃ নাহিদ হাসান জানিয়েছেন, বস্তি এলাকায় আমাদের কাউন্সিলরদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২/১ দিনের মধ্যে হয়তো তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ রবিউল ইসলাম জানান, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সচেতনতার জন্য ব্রিফিং করা হয়েছে। এছাড়া সাবান এবং কাপড় প্রদান করেছি। বস্তিবাসীর জন্য আমরা ব্লিচিং পাউডারের ব্যবস্থা করেছি, এছাড়া আমরা লিফলেট বিতরণ করেছি। প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, করোনা প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশন কি করছে সেই সম্পর্কে কোন কথা বলার এখতিয়ার তার নেই। তবে একটি সূত্র বলছে, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ করোনা ভাইরাসের বিষয়ের উপর সরকারী নির্দেশ মাথায় রেখে করণীয় কাজসমূহ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন।

Share Button