করোনার প্রভাব : বরিশালের স্বাস্থ্য সেবায় অবনতি

প্রকাশিত: ৬:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরিশালে স্বাস্থ্যসেবা খাতে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করেছে। সঠিক সময় চিকিৎসা না পাওয়া, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, করোনার নমুনা সংগ্রহ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের তালবাহানাসহ স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি শুরুর পরপরই এমন অবস্থা বিরাজ করেছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। যদিও সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসাদানকারী প্রতিষ্ঠানে বহাল রয়েছে বলে দাবি করেছেন জেলা সিভিল সার্জন। তবে বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। এক কথায় বলা যায় বরিশালের স্বাস্থ্য সেবা বর্তমানে অনেকটাই ভঙ্গুর। আর এমন অবস্থা নিরসনের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও আন্তরিকতার অভাবে বরিশাল সদর হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসকদের দেখা পাওয়াই দুস্কর। গত রোববার বেলা সাড়ে ১২ টায় সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কক্ষের দরজা বন্ধ। এমনকি ওয়ার্ডগুলোতেও চিকিৎসকদের খুব একটা দেখা মেলেনি। একাধিক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পর্যাপ্ত পিপিই’র অভাব এবং করোনায় সহকর্মী চিকিৎসকের মৃত্যুর কারণে তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। আর এ কারণে হাসপাতালে কর্তব্য পালনে তাদের মাঝে কাজ করছে এক ধরনের অনীহা।

এবিষয়ে বরিশাল সদর হাসপাতাল উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি তারিক বিন ইসলাম বলেন, চলমান সংকটময় মুহূর্তে এখানকার চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার নানা অভিযোগ তাঁর কাছেও এসেছে। তিনি হাসপাতালটির চিকিৎসকদের প্রতি বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন।

উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে ৫০ শয্যা। এখানে চিকিৎসকের ৮ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন কেবল ২ জন। একজন মেডিকেল অফিসার এবং একজন আরএমও সেখানকার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তবে বন্ধ রয়েছে করোনার নমুনা সংগ্রহ। প্যাথলজিস্ট বিভূতি রঞ্জন বাড়ৈ করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় সেখানে রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শওকত আলী বলেন, জনবণ সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া প্যাথলজিস্ট করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় বর্তমানে নতুন করে লোক খোঁজা যাচ্ছে না।

কোভিড-১৯ নমুনা পরীক্ষা নিয়ে বিমাতাসুলভ আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, প্রতিদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পটুয়াখালী সিভিল সার্জন অফিসে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখান থেকে যথাসময়ে নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য বরিশাল আরটি-পিসিআর ল্যাবে পাঠানো হয় না। ২৮ জুন পর্যন্ত মোট ৪৬৯ টি নমুনা সংগ্রহ করে আরটিপিসিআর ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই দিন পর্যন্ত ৩৬১ জনের রিপোর্ট আসে। বাকি ১০৮টি রিপোর্টের কোন হদিস নেই। এ বিষয়ে পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পটুয়াখালীতে পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় নমুনাগুলো বরিশাল কিংবা ঢাকায় পাঠাতে হয়। তাই রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হচ্ছে।

দায়সারাভাবে চলছে মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইনডোর ও আউটডোরের চিকিৎসা। করোনার উপসর্গ নিয়ে কেউ সেখানে গেলেও পাল্টে যায় চিত্র। যদিও হাসপাতালের সামনে স্থাপন করা হয়েছে দুটি বুথ। গত রোববার সেখানে বোনকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় সংবাদকর্মী কবির হোসেন প্যাদা। তিনি জানান, এখানে এখন আর কোন রোগী ভর্তি করা হয়না। রোগী এলে দায়সারাভাবে সেবা দেওয়া হয়। এমনকি স্বাস্থ্য কর্মকর্তার রুমেও যেতে পারেন না কেউ। এ বিষয়ে জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাইদুর রহমানকে ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেন নি।

বানারীপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. কবির হাসান কিছুদিন আগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাসেবা পুরোপুরিভাবে বন্ধ না হলেও ব্যাহত হচ্ছে বলে সাধারণ রোগীরা জানিয়েছেন। করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুতে বাবুগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা নিয়ে সামালোচনা শুরু হওয়ার পর বর্তমানে ইনডোর এবং আউটডোরে নামেমাত্র কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে সন্ধ্যা নদীর ওপারে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানে রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিক অবস্থায়ও অনেকাংশেই কম ছিল। এ বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুভাস সরকারকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

গৌরনদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইনডোর ব্যবস্থা এখন অনেকটাই অচল। কোন রোগী ভর্তি করা হচ্ছেনা এখানে। করোনার নমুনা সংগ্রহ নিয়েও আছে জটিলতা। আর আউটডোরে স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক সেবা প্রদান করছেন। ফলে অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সাইদ মো. আমারুল্লাহ বলেন, এখানে কিটের সংকট রয়েছে। নমুনার রিপোর্ট পেতেও কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে রোগী ভর্তি করছেন না তারা।

সোয়াব স্টিক (কাঠি) না থাকায় গত ১০ দিন ধরে করোনার নমুনা সংগ্রহ করতে পারছে না লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ। ফলে উপসর্গ থাকা অনেকেই দিতে পারছেন না করোনার নমুনা। এ বিষয়ে ভোলার সিভিল সার্জন রতন কুমার ঢালী বলেন, গত কয়েকদিন ধরে আমরা সোয়াব স্টিক (কাঠি) সরবরাহ পাইনি, তাই এমনটি হয়েছে। তবে আগামী দু’এক দিনের মধ্যে স্যাম্পল সংগ্রহ করতে পারবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো।

এসব প্রসঙ্গে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, হাসপাতালে রোগী এলে করোনায় আক্রান্ত কিনা বিষয়টি আগে নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এ কারণে চিকিৎসকরা হয়তো অতি সতর্ক রয়েছেন। তবে সবধরনের স্বাস্থ্য সেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহাল আছে। এছাড়া করোনার নমুন সংগ্রহে ব্যবহৃত কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে তাদের আছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন।

(সম্পাদনা :_-_ #এম বাপ্পি )

Sharing is caring!