করোনাকালে বেদে সম্প্রদায়ের মানবেতর জীবন যাপন

প্রকাশিত: ১:২৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০২০

জুনাইদ খন্দকার ॥

বেদে সম্প্রদায় একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। এরা সাধারণত আঞ্চলিক ভাষায় বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত। কথিত আছে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সাথে এরা ঢাকায় এসেছিল। এরা প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে এবং পরে সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তারা সাধারণত নৌকায় বসবাস করে। নৌকায় করে একেক সময় একেক যায়গায় অস্থায়ীভাবে ঘাঁটি বেঁধে অবস্থান করে।

বেদে মহিলারা বেশিরভাগ সিঙ্গা লাগানো, দাঁতের পোকা ফেলানোসহ ঝাঁড়ফুক করে নিজেদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আবার কিছু বেদে নারী ঘুরে ফিরে চুরি-ফিতা বিক্রি করেন। তবে কিছু পুরুষ বেদে নদীতে মাছ শিকার আর সাপের খেলা দেখালেও বেশিরভাগ বেদে পুরুষের সময় কাটে অলসভাবে।

কিন্তু আধুনিক সভ্যতা আর প্রযুক্তির জাঁতাকলে বেদে সম্প্রদায়ের এ ঐতিহ্য আজ হারাতে বসেছে। আধুনিক যুগের মানুষ আজ তাদের এ তন্ত্র মন্ত্রের চিকিৎসাকে বিশ্বাস করে না। তাই কমে গেছে তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগার। তার মধ্যে বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে এ সম্প্রদায়কে। কেননা বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হলেও পাচ্ছেন না তারা নাগরিক কিংবা পূরণ হচ্ছে না মৌলিক অধিকার।

শুধু তাই নয়, চলমান মহামারিতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সরকারি এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত মানবিক সহায়তা পেলেও তা এখনো গিয়ে পৌছেনি বেদে পল্লীতে। ফলে অনেকটা না খেয়ে অনাহার-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষগুলো।

এ নিয়ে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানিয়েছেন, নগরীর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের গড়িয়ারপাড় এলাকার বেদে পল্লীর বাসিন্দা জাকির ও শাবনুর। তারা বলেন, ‘করেনাকালীন সময়ে আমাদের আয় রোজগার নেই বললেই চলে। এখন সারা দিন ঘরে সর্বোচ্চ ১০০-২০০ টাকা পর্যন্ত উপার্যন হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ সময় একেবারে খালি হাতেই ফিরতে হয়। আর এ দিন আমাদের না খেয়েই থাকতে হয়।

তারা বলেন, ‘করোনার আগে আমরা বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে আয় করেছি। কিন্তু করোনাকালিন সময়ে মানুষ আমাদের গ্রামে ঢুকতে দেয় না। তাই উপার্যন হয় না।

একইভাবে দুর্দশার কথা তুলে ধরেন গড়িয়ারপাড় এলাকার বেদে পল্লীর বাসিন্দা নৈদার চান। তিনি বলেন, আমরা এই এলাকার ভোটার। সরকার আমাদের নাগরিকত্ব দিলেও কোন ধরণের নাগরিক সুবিধা আমরা পাচ্ছি না। এই করোনাকালিন সময়েও কেউ আমাদের খোঁজ খবর নিতে আসেনি। অথচ ভোটের সময় এলেই জনপ্রতিনিধিরা ভোটের জন্য আশ্বাসের ফুলঝুড়ি নিয়ে আসে। ভোট শেষে তাদের আর কোন খবর থাকে না।

তিনি বলেন, ‘এই করোনা পরিস্থিতি শুরুর পরে গত দুই মাস পূর্বে একবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আমাদের কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু অন্য কোন নেতা বা জনপ্রতিনিধিরা আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। শুনছি সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে ত্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু তাও আমাদের এই বেদে পল্লী পর্যন্ত এসে পৌছায়নি। এমন পরিস্থিতিতে পরিবার নিয়ে বেশিরভাগ সময় না খেয়েই দিন কাটছে দাবি করে সরকারের কাছে সাহাজ্য সহযোগিতার হাত বেড়ান বেদে পল্লীর মানুষগুলো।
অপরদিকে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের শিকারপুর ব্রিজ সংলগ্নে গড়ে উঠেছে অনেক বড় একটি বেদে পল্লী। এছাড়া বরিশাল শহরের অদূরে কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতুর ঢালে এবং সদর উপজেলার বন্দর থানা এলাকায় রয়েছে বেদে সম্প্রদায়ের ঘাঁটি।

এসব বেদে পল্লী ঘুরে দেখা গেছে করুন পরিস্থিতি। ভাসমান এই জনগোষ্ঠী নাগরিকত্ব পেলেও ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্ছিত তারা। এসব পল্লীর মানুষ বলেন, ‘আমরা পেশার পরিবর্তন চাই। অন্যান্য মানুষের মতই সমাজে উপার্জন করে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু সমাজ আমাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না। আমরা পড়াশুনা না জানায় অন্য পেশায় যেতে পারছি না। কেউ কাজে নিতে চাচ্ছে না। সন্তানটিকে পর্যন্ত লেখা-পড়া করাতে পারছি না। শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে বেচে আছি। আমাদের থেকে রোহিঙ্গারাও বেশি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বেদে সম্প্রদায়ের বঞ্চিত মানুষেরা।

অবহেলিত বেদে সম্প্রদায়ের এসব সমস্যা নিয়ে কথা হয় বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম. অজিয়র রহমান এর সাথে। এসময় তিনি বলেন, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত সকল সম্প্রদায়ের মাঝেই ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করেছি। আর এই কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। তাই কেউ একদমই কোন সহায়তা পাননি এটা সঠিক নয়। তার পরেও কেউ যথাযথভাবে আবেদন করলে আমরা তাদেরকে সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনায় আনব।

Sharing is caring!