ঐতিহ্যবাহী ‘বরিশাল কলেজ’র নাম পরিবর্তনের পক্ষে বিপক্ষে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি

প্রকাশিত: ৩:৫৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০

শফিক মুন্সি ॥ সরকারি বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন করে ‘মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সরকারি কলেজ’ করার পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে বরিশাল নগরী জুড়ে। গত দুদিনের নানা কর্মসূচির কারণে নগর আওয়ামীলীগ ও স্থানীয় সুশীল সমাজের মধ্যকার বিভেদ এসেছে প্রকাশ্যে। গতকাল রোববার সকাল ১১ টায় নগরীর রিপোর্টার্স ইউনিটি কার্যালয়ে কলেজটির নাম পরিবর্তনের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে ‘অশ্বিনী কুমার স্মৃতি সংসদ’। অন্যদিকে কলেজটির নাম পরিবর্তন না করার আহ্বান জানিয়ে গত শনিবার মানববন্ধন করার পর গতকাল বরিশাল জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে কলেজটির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ। এ পক্ষটির নেতৃত্বে মূলত স্থানীয় আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
গত শনিবার নগরীর অশ্বিনী কুমার দত্ত (টাউন) হলের সামনে বরিশাল কলেজের নাম অপরিবর্তিত রাখার দাবিতে বৃষ্টি ও করোনা প্রতিরোধক স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে মানববন্ধন করেছেন কলেজটির বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী পরিচয় দানকারীরা। তবে এই পক্ষটির মূলে ছিলেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম জাহাঙ্গীর, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হেমায়েত উদ্দিন সুমন সেরনিয়াবাত সহ আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

এসময় বক্তারা জানান, বরিশাল কলেজের নাম দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিকভাবে সকলের নিকট পরিচিত। এই নামের সঙ্গে ইতিহাসের অনেক ঘটনা জড়িত। অন্যদিকে কলেজটির সম্পত্তি অশ্বিনী কুমার দত্তের দানে নয় বরঞ্চ সরকারের পক্ষ থেকে ক্রয়কৃত। তাই তাঁর নামের সঙ্গে এই কলেজটির আলাদা করে কোন উল্লেখযোগ্য মেলবন্ধন নেই।

তারা আরো বলেন, যেহেতু দীর্ঘদিন যাবত সারা দেশের মানুষের কাছে কলেজটি বরিশাল কলেজ নামেই পরিচিত, তাই আমরা সকলে সম্মিলিত ভাবে প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই ঐতিহাসিক এ কলেজটির নাম পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত থেকে যেন তারা সরে আসে। তবে কলেজটির যেকোনো একটি ভবনের নাম বরিশালে জন্মগ্রহণ করা এই মহান ব্যক্তিটির নামে হতে পারে বলে জানিয়েছেন মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা।

এই পক্ষটি গতকাল বেলা ১২ টায় জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমানের কাছে তাদের দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। এই কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন, বিসিসি’র ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইদ আহমেদ মান্না প্রমুখ। এখানে উল্লেখ্য, কলেজটির নাম অপরিবর্তিত রাখার জন্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী সকলে বিসিসি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বলয়ের পরিচিত মুখ।

অন্যদিকে বরিশাল কলেজের নাম মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে নামকরণের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করেছে ’অশ্বিনী কুমার স্মৃতি সংসদ’। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা, প্রবীণ আইনজীবী ও সাংবাদিক এস এম ইকবাল সহ বরিশালের সুশীল সমাজের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি স্নেহাংশু বিশ্বাস বলেন, কলেজটি মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের বাসভবনে স্থাপিত। এছাড়া বরিশালের শিক্ষা প্রসারে তাঁর অবদান অনেক। তাই আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী কলেজটির বর্তমান নাম পরিবর্তন করে ‘মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সরকারি কলেজ’ করা হোক।

এছাড়া বরিশাল কলেজের নাম পরিবর্তন করার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে গতকাল রোববার বিকেলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী’র বরিশাল জেলা ও মহানগর শাখা। তাদের প্রেরিত এক যুক্ত বিবৃতিতে সংগঠনটির নেতারা জানান, সরকারি বরিশাল কলেজের নাম মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে নামকরণের জন্য জেলা প্রশাসকের চিঠির প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্মতি জ্ঞাপন করে সুপারিশ করায় তারা সংশ্লিষ্টদের সাধুবাদ জানাচ্ছেন। বিবৃতিতে সাম্প্রদায়িক এবং প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র রুখে নাম পরিবর্তন কার্যক্রম বাস্তবায়নের দ্রুত দাবি জানানো হয়।

এসব ব্যাপার নিয়ে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আপাতত এসব নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হন নি। উল্লেখ্য, স্থানীয় সংস্কৃতিজনদের দাবির প্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বরিশাল জেলা প্রশাসন কলেজটির নাম পরিবর্তনের জন্য উপরমহলে চিঠি চালাচালি শুরু করে। গত ২৯ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কলেজটির বর্তমান নাম পরিবর্তন করে ‘মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সরকারি কলেজ’ নামে রাখার জন্য সুপারিশসহ মতামত চায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের কাছে। এসব গোপনীয় প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে তেমন কোন উচ্চবাচ্য ছিল না বরিশালে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকা ‘আজকের বার্তা’ গত ৫ জুলাই সর্বপ্রথম ‘পাল্টে যাচ্ছে সরকারি বরিশাল কলেজের নাম’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। এর পরই প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সবার সামনে আসে।