আমতলীতে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নৈরাজ্য : পাঁচগুণ মূল্যে টেস্ট : নীরব স্বাস্থ্য বিভাগ

প্রকাশিত: ৭:৪২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০২০

মোঃ জসিম উদ্দিন সিকদার, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি ॥

সরকারী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে লাইসেন্স বিহীন ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে বরগুনার আমতলীতে ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সরকারী মূল্য তালিকা ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মূল্য তালিকায় রয়েছে আকাশ পাতাল ব্যবধান। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচগুণ মূল্যে টেস্ট করছে। অদক্ষ ও হাতুড়ে প্যাথলজিস্ট, টেকনিশিয়ান ও এক্সরে টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম। এক্সরে মেশিন স্থাপনে সরকারী নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের নানাবিধ হয়রানীর অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। নীরব জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর এ নৈরাজ্য রোধের কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নেই। ভুক্তভোগীরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এ নৈরাজ্য বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবী করেছেন। সরকারী নির্দেশনা তারা মানছেন না। নিজেদের গড়া অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশনাই তাদের মূল ভিত্তি।

জানাগেছে, আমতলী উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের পঞ্চাশ থেকে এক’শ গজ দূরত্বে চারি পাশে গড়ে উঠেছে ৭ ডায়াগনস্টিক সেন্টার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ঘিরে রেখেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। এর মধ্যে বেলিভিউ, মেডিনোভা, সময় মেডিকেয়ার হসপিস, তামান্না, আমতলী ডিজিটাল, হাসিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গা-ঘেঁষে পঞ্চাশ থেকে এক’শ গজ দূরত্বে এবং আমতলী মাতৃসদন ক্লিনিক দুই কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। সরকারী নির্দেশনা উপেক্ষা করে এ ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো গড়ে উঠেছে। এ সকল ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মধ্যে অধিকাংশের সরকারী কোন অনুমোদন নেই। অভিযোগ রয়েছে এ ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচগুণ মূল্যে টেস্ট করা হচ্ছে। সরকারী কোন নিয়মনীতি তারা মানছেন না। তাদের নিজেদের নিয়মেই চলছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। অদক্ষ প্যাথলজিস্ট, টেকনিশিয়ান ও এক্সরে টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে আমতলী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্সরে মূল্যের চেয়ে ছয়গুণ বেশী নিচ্ছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। প্যাথলজি পরীক্ষা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয়গুণ বেশী নিচ্ছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ। সরকারী হাসপাতালে এক্সরে মূল্য ৮/১০ ইঞ্চি ৫৫ টাকা। ওই এক্সরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৩’শ ৫০ টাকা। ১৪/১৪ ইঞ্চি এক্সরের মূল্য ৭০ টাকা। ওই এক্সরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিচ্ছে ৪’শ ৫০ টাকা। এভাবেই ডিজিটাল এক্সরে মেশিন বলে পুরাতন মেশিন দিয়ে এক্সরে করে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে পাঁচগুণ টাকা। এছাড়া আমতলী হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগে ১৮ ধরনের পরীক্ষা করা হয়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো প্যাথলজি পরীক্ষায়ও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচগুণ টাকা বেশী নিচ্ছে। সরকারী হাসপাতালে টিসি, ডিসি, ইএসআর ও হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার মূল্য এক’শ ৫০ টাকা।

ওই পরীক্ষায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে নিচ্ছে ৪’শ টাকা। আরএ টেস্ট সরকারী হাসপাতালে ৬০ টাকা। ওই টেস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৩’শ ৫০ টাকা। এইচবিএসএজি টেস্ট সরকারী হাসপাতালে এক’শ ৫০ টাকা। ওই টেস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৪’শ ৫০ টাকা। সরকারী হাসপাতালে প্রস্রাব পরীক্ষায় বিটি সিটির মূল্য ৩০ টাকা। ওই পরীক্ষা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৩’শ টাকা। প্রেগনেন্সি টেস্ট হাসপাতালে ৮০ টাকা। ওই টেস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিচ্ছে ২’শ ৫০ টাকা। আলট্রাসনোগ্রাম প্রকারভেদে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিচ্ছে ৪’শ ৫০ টাকা থেকে ৭’শ টাকা। যা পাশর্^বর্তী কলাপাড়া উপজেলায় ২’শ টাকা। এভাবেই প্রতি পরীক্ষায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয়গুণ বেশী নিচ্ছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। স্বাস্থ্য প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন অবস্থা হলেও দেখেও না দেখার ভান করছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানাগেছে, চিকিৎসকরা টেস্টের নামে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থেকে পার্সেন্টিজ (%) সুবিধা নিচ্ছেন। তাদের সুবিধা নেয়ার কারণেই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্টের মূল্য তালিকায় এমন হেরফের। এছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা চিকিৎসকদের সুবিধা নেয়ায় নিজেরা ইচ্ছা মাফিক মূল্য বাড়িয়ে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা এ কথা বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কয়েকজন কর্মচারী। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের মধ্যেও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নৈরাজ্য থেমে নেই। চালিয়ে যাচ্ছে তাদের গলাকাটা ব্যবসা।
আঠারোগাছিয়া ইউনিয়নের শাহ আল হাওলাদার বলেন, বেলিভিউ ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ডান হাতের একটি আঙুলের এক্সরে ৩’শ ৫০ টাকায় করিয়েছি। কম নেয়ার জন্য অনুরোধ করলেও তারা নেয়নি।

আমতলী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মোঃ ফকু মিয়া বলেন, আমতলী ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর নৈরাজ্য দেখার কেউ নেই। টেস্টের নামে রোগীদের কাছ থেকে তারা ইচ্ছা মাফিক টাকা আদায় করছে। তিনি আরো বলেন, হাসিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার একটি প্যাথলজি টেস্টে আমার কাছ থেকে এক হাজার পঞ্চাশ টাকা নিয়েছে। আমি কম নেওয়ার অনুরোধ করেছিলাম কিন্তু তারা নেয়নি।

আমতলী বেলভিউ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, সরকার কোন মূল্য তালিকা আমাদের দেয়নি। আমরা উপজেলা ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের মূল্য তালিকা অনুসারে টেস্টের টাকা নিচ্ছি। অ্যাসোসিয়েশনের দেয়া তালিকার বাহিরে বেশী টাকা নিচ্ছি না।
আমতলী উপজেলা ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, সরকারী অনুমোদন ও নির্দিষ্ট দূরত্বে ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করেছে কিনা তা আমার জানা নেই। তিনি আরো বলেন, সরকারী ভাবে টেস্টের কোন মূল্য তালিকা নেই। সরকারী মূল্য তালিকা দেয়া হলে তা মেনে নিয়ে টেস্টের ফি নেয়া হবে।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শংকর প্রসাদ অধিকারী ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে মূল্য তালিকায় গড়মিলের কথা স্বীকার করে বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো হাসপাতালের খুবই কাছাকাছি। এ সকল ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সরানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ হুমায়ূন শাহিন খান বলেন, উপজেলা হাসপাতালের কাছাকাছি ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করা যাবে না। কেউ যদি করে থাকে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, হাসপাতালের মূল্য তালিকার সাথে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মূল্য তালিকার অনেক হেরফের রয়েছে। ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকদের সাথে কথা বলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে মূল্য তালিকা সংশোধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Sharing is caring!