অনিরাপদ বরিশালের নৌপথ

প্রকাশিত: ৭:১০ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

*অদক্ষ চালক দিয়ে নৌযান পরিচালনা
*উদ্ধার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
*অভিযোগের তীর লঞ্চ মালিকদের দিকে

শফিক মুন্সি ॥ গত ২৯ জুন সকালের দিনের আলোয় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে সংঘটিত নৌ দুর্ঘটনায় স্তম্ভিত সারা দেশের মানুষ। নদী বিস্তৃত বরিশালের নৌপথের নিয়মিত যাত্রীরাও সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক দুর্ঘটনার ঘটনায় ভীত। নৌপথে চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা তাড়া করে বেড়াচ্ছে প্রতিদিন হাজারো যাত্রীকে। তাদের মতে অদক্ষ চালক দিয়ে নৌযান পরিচালনা, ফিটনেসহীন নৌযান দিয়ে পরিবহন ও নৌপথে শৃঙ্খলা না থাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। অন্যদিকে দুর্ঘটনার কবলে পড়া নৌযানগুলো উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের কারিগরি দুর্বলতাও এসেছে প্রকাশ্যে। অদক্ষ চালক দিয়ে নৌযান পরিচালনার দায় লঞ্চ মালিকদের ওপর চাপাচ্ছেন নৌ কর্তৃপক্ষ। তবে লঞ্চ পরিচালনার সঙ্গে জড়িত মানুষদের সাথে সাথে সাধারু যাত্রীরা কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবকে সামনে এনেছেন নৌ দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বরিশাল অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে আতঙ্কিত হবার মতো নানা চিত্র। তাদের মতে বরিশাল নদী বন্দর থেকে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার অভ্যন্তরীণ ১১ টি ও দূরপাল্লার ১টি রুটে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক নৌযান (মাঝারি ও বৃহৎ) যাত্রী পরিবহন করে। এসব নৌযান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ডুবে গেলে সেগুলো উদ্ধারে ৬০ মেট্রিকটন উত্তোলন ক্ষমতা সম্পন্ন ২টি ও ২৫০ মেট্রিকটন উত্তোলন ক্ষমতা সম্পন্ন আরো ২ টি উদ্ধারকারী জাহাজ তাদের সংগ্রহে আছে। কিন্তু বর্তমানে মাঝারি একটি নৌযানের ওজন ৩০০ মেট্রিকটনের বেশি। এছাড়া ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যাত্রী পরিবহন করা বিলাসবহুল নৌযানগুলোর স্বাভাবিক ওজন ১০০০ মেট্রিকটনের কম নয়। যে কারণে দুর্ঘটনায় পর্যবসিত হওয়া সাধারণ নৌযান (লঞ্চ অথবা জাহাজ) উদ্ধারে বেগ পেতে হয় তাদের।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে বরিশাল নদী বন্দরে ভিড় করা একাধিক যাত্রী সাধারণের সঙ্গে কথা হয়। এসময় তারা অভিযোগের সুরে বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটের বেশির ভাগ লঞ্চে আপদকালীন সময়ে জীবন বাঁচানোর পর্যাপ্ত উপকরণ থাকে না। এর ওপর লঞ্চ পরিচালনাকারীর (সারেং ও সুকানি) বেশিরভাগই অদক্ষ। এরই সাথে অভ্যন্তরীণ রুটের অনেক লঞ্চের ফিটনেস ঠিক নেই বলেও জানান তারা। এসকল যাত্রীরা অভিযোগ করেন, নৌ কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো তদারকি করছে না বলেই এমন বিপদজনক অবস্থা বিরাজ করছে এই অঞ্চলের নৌপথগুলোতে। অন্যদিকে অদক্ষ চালকদের দিয়ে লঞ্চ পরিচালনা করার অভিযোগ উঠেছে খোদ চালকদের (সারেং) মধ্য থেকেই।

সরেজমিনে এই প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে কথা হয় বরিশাল বিভাগের অভ্যন্তরীণ রুটের দুজন ও দূরপাল্লার রুটের একজন লঞ্চ চালকের সঙ্গে। তারা সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লঞ্চ মালিকেরা কম বেতনে অদক্ষ চালক নিয়োগ করে থাকেন লঞ্চ পরিচালনার জন্য। যাদের বেশিরভাগেরই লঞ্চ চালনার প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা ব্যবহারিক জ্ঞান কম। অনেকে সুকানিকে (লঞ্চের সাধারণ কর্মচারী) সারেং (চালক) হিসেবে কাজ করান। অভ্যন্তরীণ রুটে প্রায় ত্রিশ বছর ধরে লঞ্চ পরিচালনা করা একজন সারেং (চালক) বলেন, আমাকে দিয়ে একদিন লঞ্চ চালাতে মালিকের কয়েক হাজার টাকা প্রয়োজন। সেখানে অদক্ষ একজনকে দিয়ে লঞ্চ চালাতে পাঁচশো টাকার বেশি দরকার পড়ে না। খরচ কমানোর জন্য মালিকেরা এই সুযোগ নেন। যে কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। তবে মালিকদের সাথে সাথে নৌ কর্তৃপক্ষকেও দুষলেন এই তিনজন চালক। তারা উল্লেখ করেন, কর্তৃপক্ষ যদি যথাযথ তদারকি করতো তবে অদক্ষ চালক দিয়ে লঞ্চ পরিচালনা করার ঘটনা বন্ধ করা যেতো।

অদক্ষ চালক দিয়ে নৌযান পরিচালনা করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলো নৌ কর্তৃপক্ষের কথাতেও। বরিশাল নদী বন্দর (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু জানান, প্রতিটি লঞ্চ ছাড়ার আগে আমাদের পক্ষ থেকে লঞ্চের চালক সহ নিরাপত্তার অন্যান্য বিষয়ে তদারকি করা হয়। তবে কিছু কিছু সময় অভ্যন্তরীণ রুটের নৌযান মালিকেরা আমাদের চোখ এড়িয়ে সুকানি অথবা অদক্ষ চালক দিয়ে নৌযান পরিচালনার চেষ্টা করে থাকে। দুর্ঘটনায় কবলিত লঞ্চকে উদ্ধার করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি জানান, বর্তমানে উদ্ধারকারী জাহাজের চেয়ে এয়ার লিফটিং (বাতাস প্রতিসরণ) পদ্ধতি অবলম্বন করে ডুবন্ত বা ডুবতে থাকা নৌযান উদ্ধার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই পদ্ধতি আরো কার্যকর করা গেলে উদ্ধারকারী জাহাজের ওপর ভরসা কমবে।

Sharing is caring!