অতীতে এ জিম্বাবুয়ে বধেই ফর্মে ফিরেছিল টাইগাররা, এবারও কি…

প্রকাশিত: ২:২১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০২০

জিম্বাবুয়েকে ঘরের মাঠে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি- তিন ফরম্যাটেই হোয়াইটওয়াশ করেছে বাংলাদেশ।

একমাত্র টেস্ট ম্যাচ জিতেছে ইনিংস ও ১০৬ রানের বড় ব্যবধানে। তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেটি (বাংলাদেশ জিতেছে ৪ রানে) ছাড়া বাকি দুই খেলায় লড়াই হয়নি একটুও। টাইগাররা জিতেছে ১৬৯ ও ১২৩ (ডি/এল ম্যাথডে) রানের বিরাট ব্যবধানে। একই চিত্র টি-টোয়েন্টি সিরিজেও। প্রথম দিন ৪৮ রানে জেতা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল শেষ হাসি হাসলো ৯ উইকেটের অনায়াস জয়ে।

টাইগারদের এ অনায়াস জয় আসলে কী বার্তা বহন করে? বাংলাদেশ এগিয়েছে? ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে তামিম, লিটন, সৌম্যরা অনেক বেশি ভাল খেলে জিম্বাবুইয়ানদের ধরাশায়ী করেছেন? নাকি জিম্বাবুয়ের এ দলটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল দল, তাই সিরিজ একপেশে হয়েছে ও টিম বাংলাদেশকে বেশি শক্তিশালী মনে হয়েছে?

আসলে এ বিরাট জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে উন্নতির পরিচায়ক কি না? বেশ কজন তরুণ, নবীন ও অনভিজ্ঞ ক্রিকেটারে সাজানো জিম্বাবুয়ের মতো দুর্বল দলের বিপক্ষে এমন বিপুল বিজয়ে আসলে কোন লাভ হবে কি না?- তা নিয়ে চলছে আলোচনা- পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

এটা সত্য জিম্বাবুয়ের যে দলটি টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি সিরিজে অংশ নিলো- সেটা খুবই কমজোর দল। যাদের বোলিং নেহায়েত সাদামাটা ও নির্বিষ, ব্যাটিংটাও অগোছালো। সব মিলে প্রতিপক্ষ হিসেবে দুর্বল দলই জিম্বাবুয়ে। অনেকেরই মতে এটাই জিম্বাবুয়ের সবচেয়ে দুর্বল, কমজোরি ও অনভিজ্ঞ টিম। যা আগে কখনো দেখা দেখা হয়নি।

তাই যদি সত্য হয়, তাহলে সেই দলকে টেস্টে ইনিংসে হারানো, তিন ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ আর টি-টোয়েন্টি সিরিজে উড়িয়ে দিয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলার কী আছে? এই দলের বিপক্ষে গন্ডায় গন্ডায় সেঞ্চুরি, চার-ছক্কার অনুপম প্রদর্শনীতে মাঠ মাতানো আর সাফল্যের সিড়ি বেঁয়ে ওপরে ওঠায় কি-ইবা এমন বড় কৃতিত্ব আছে? এটা কি আগামীতে বড় দলের সঙ্গে খেলায় কোন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে?

নাকি গত নভেম্বরে ভারতে গিয়ে খাবি খাওয়া আর এই তো জানুয়ারিতে রাওয়ালপিন্ডি ও লাহোরে টেস্ট-ওয়ানডেতে চরমভাবে পর্যুদস্ত হওয়ার পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এ জয় ও সাফল্য স্রেফ খাদের কিনারা থেকে উঠে আসা? অনেকেরই কথা, যে দল ভারত ও পাকিস্তানে গিয়ে পাত্তাই পায় না, নাস্তানাবুদ হয়ে ফিরে আসে, ব্যাটিং-বোলিংয়ে মনে হয় নেহায়েত দুর্বল ও ধারহীন- সেই দল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নৈপুণ্যের দ্যুতি দেখিয়ে জিতেছে বলেই খুব খুশি হওয়ার কিছু নেই।

দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়েকে হারানো এখন আর কোনো বড়সড় সাফল্য নয়। এ বিপুল বিজয় আসলে কোন উন্নতির নির্দেশ করে না। আসল লড়াই হবে দেশের বাইরে। বড় দলগুলোর সঙ্গে। তখন ভাল খেলে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে পারলে বলা যাবে উন্নতি হয়েছে।

তাহলে কি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই তিন ফরম্যাটের সাফল্যে মোড়ানো জয়ে কোনো প্রাপ্তি, অর্জন নেই? এটা সত্য দল হিসেবে জিম্বাবুয়ে দুর্বল। দলটির বোলিং ও ব্যাটিং শক্তি নেহায়েত কমজোর। এ দলের বিপক্ষে ভাল খেলা, নৈপুণ্যের দ্যুতিতে মাঠ মাতানো আর সহজ জয়ই স্বাভাবিক।

তাই বলে টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতে পাওয়া একতরফা ও বড় জয়গুলো অর্থহীন- তামিম, লিটন, মুশফিক, মুমিনুল আর সৌম্য সরকারের এমন সুন্দর, সাবলীল ও চিত্তাকর্ষক ব্যাটিংয়ের কোনো মূল্য নেই- তাও নয়।

প্রতিপক্ষ যেই হোক, তার শক্তি-সামর্থ্য যত কমই থাকুক না কেন, ‘জয় জয়ই’। সাফল্যের একটা প্রাপ্তি অবশ্যই আছে। তা হলো সবার আগে জেতার অভ্যাসটা জন্মায়। আসলে জেতারও একটা অভ্যাস লাগে। পরপর কয়েক ম্যাচ জিতলে সেই জেতার অভ্যাস তৈরি হয়, নিজের শক্তি ও সাহস বাড়ে, ভেতরে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস জন্মায় যে আমরাও পারি। যা পরবর্তীতে ভাল খেলার রসদ হিসেবে কাজে দেয়।

ইতিহাস জানাচ্ছে এর আগে দুইবার এমন হয়েছে। যখন ছোট ও দুর্বল দলগুলোর বিপক্ষে জিতে জিতেই জেতার অভ্যাসটা তৈরি হয়েছিল। টাইগাররা শিখেছিল কীভাবে জিততে হয়। জেতার প্রক্রিয়া কী? কী কী কাজ করতে পারলে প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করা যায়?

সেই শিক্ষা ও ধারণা প্রথম জন্মেছিল ২০০৬-২০০৭ সালে। মানে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপেরও ঠিক একবছর আগে। ঐ দুইবছর বিশেষ করে ২০০৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া, স্কটল্যান্ড, বারমুডা আর কানাডার মত দলগুলোর সঙ্গে বেশি বেশি ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ।

এক ২০০৬ সালে ২৩টি ম্যাচ জিতেছিল টাইগাররা। ঐ বছর মোট ২৮ ম্যাচের ভেতরে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ৮টি, কেনিয়ার বিপক্ষে ৭টি, স্কটল্যান্ডের সাথে ২টি আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি জয় ছিল টিম বাংলাদেশের। পরে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিম্বাবুয়ের মাটিতে তিনটি এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে তিন জাতি আসরে বারমুডা ও কানাডার বিপক্ষে একটি করে ম্যাচ জিতেছিল টাইগাররা।

হোক তা দুর্বল জিম্বাবুয়ে আর বাকি সব আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশ কেনিয়া, স্কটল্যান্ড, বারমুডা ও কানাডার সঙ্গে। তারপরও জয় মানে জয়ই। তাতে সাহস, আস্থা, মনোবল এবং সামর্থের প্রতি বিশ্বাস বেড়েছিল অনেকটাই। আমরা শুধু হারি না, জিততেও পারি, জেতার শক্তিসামর্থ্য আছে আমাদেরও- এই বিশ্বাসবোধ হয়েছিল জাগ্রত।

সেই বিশ্বাস ও আস্থা ও আত্মবিশ্বাস থেকেই ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ভাল করার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। আর তাই বিশ্বকাপের ঠিক আগে গা গরমের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের বাজার গরম করে ফেলেছিল হাবিবুল বাশারের দল। বিশ্বকাপের মাঠে প্রথম দিন মাঠে নেমে মাশরাফির ৪ উইকেট আর তিন নবীন ও সাহসী যোদ্ধা তামিম, সাকিব আর মাশরাফির ফিফটিতে ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল বাশারের দল।

তারপর সেরা আটের লড়াইয়ে গিয়েও অব্যাহত ছিল টাইগারদের দাপট। দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলও হালে পানি পায়নি। মোহাম্মদ আশরাফুলের অসাধারণ উইলোবাজি আর রাজ্জাক, রফিক, সাকিব ও সৈয়দ রাসেলের বোলিংয়ে আরেক বড় জয়ে রীতিমত হইচই ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ।

একইভাবে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের আগেও এই জিম্বাবুয়েকে হারিয়েই শক্তি ও সাহসের সঞ্চয় ঘটেছিল। সেবার বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে জিম্বাবুয়েকে ঘরের মাঠে ৫-০’তে বাংলাওয়াশ করে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড যাত্রা। অথচ একইবছর ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা (৪), ভারত (৩), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (৩), পাকিস্তান (১) ও আফগানিস্তানের (১) বিপক্ষে ১২ ওয়ানডে খেলে সবকটায় হেরেছিল মুশফিকুর রহীমের দল।

ঐ বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দেশের মাটিতে ওয়ানডেতে ৫-০’তে নিরংকুশ বিজয় বদলে দিয়েছিল পুরো দলের চেহারা। ভেতরে এক অন্যরকম বিশ্বাস ও আস্থা জন্ম নিয়েছিল। তারপর বিশ্বকাপে গিয়ে আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেয়া।

এরপর বিশ্বকাপ শেষে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ। যে পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের একটি মাত্র জয় ছাড়া আর কখনও হারানো সম্ভব হয়নি, সেই পাকিস্তানিদের ৩-০’তে ধবলধোলাই করে ছাড়ে টাইগাররা। তারপর পর্যায়ক্রমে ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাশক্তির বিপক্ষেও প্রথমবার ঘরের মাঠে ২-১’এ সিরিজ বিজয়ের বড়সড় কৃতিত্ব ধরা দেয়।

মোদ্দা কথা, ছোট দলকে হারিয়ে সেই যে শক্তি ও সাহস ভেতরে জন্ম নেয়, সেটাই পরবর্তীতে বড় দলকে হারাতে বড় সাহস ও সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে।

কাজেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই সাফল্যও হয়তো বাংলাদেশকে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে। গত ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে শেষ দুই ম্যাচ দিয়ে যে বিপর্যয় সূচিত হয়েছে, পারফরম্যান্সের গ্রাফ নীচের দিকে নেমেছে, সেটা আবার ওপরের দিকে উঠতেও পারে।

তামিমের রানখরা কেটে গেছে, লিটন দাসের উইলোতে ফুলের সুবাস। মুশফিক, মুমিনুল টেস্টে বড় ইনিংস খেলেছেন। মাঝে টি-টোয়েন্টি’তে একদম অনুজ্জ্বল সৌম্য সরকারের ব্যাটও আবার ছন্দ ফিরে পেয়েছে- সবই ইতিবাচক দিক এবং ভবিষ্যতে ভাল খেলার কার্যকর রসদ।

যেহেতু ২০০৭ ও ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের আগে এই দুর্বল দলগুলোকে হারিয়েই রাঘব বোয়াল শিকারের শক্তি, সাহস ও সামর্থ্য তৈরি হয়েছিল- কে জানে এবছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই অনায়াস ও বিপুল বিজয়ও হতে পারে সেই আসরের উন্নতির বড় দাওয়াই ও ভাল খেলার রসদ।

২০০৬ ও ২০১৪ সালে ছোট ও দুর্বল দলগুলোকে হারিয়েই ২০০৭ ও ২০১৫ সালে বড় দলগুলোর বিপক্ষে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস পেয়েছিল বাংলাদেশ। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল ওয়ানডে ফরম্যাটের প্রতিষ্ঠিত দল হিসেবে। এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেও মিললো প্রায় একইধরনের সাফল্য। এখন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও নবজাগরণ ঘটে কি না টাইগারদের- সেটিই দেখার।

Sharing is caring!