আজকের বার্তা | logo

১০ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৪শে মার্চ, ২০১৯ ইং

ছুটিতে গেছেন ব্রাজিল ঈশ্বর

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮, ১২:৩৭

ছুটিতে গেছেন ব্রাজিল ঈশ্বর

অনলাইন সংরক্ষণ  //  ‘ঈশ্বর একজন ব্রাজিলীয়’—কথাটি ফুটবলের দেশে বেশ প্রচলিত। এই লোকবচনকে উপজীব্য করে একটি চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ঈশ্বর ব্রাজিলীয় হলেও তিনি হয়তো নিদ্রামগ্ন, কিংবা কোনো কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর শ্যামল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তা না হলে এমন বিপাকে পড়বে কেন ব্রাজিল?

অর্থনৈতিক সংকট, অপরাধের উচ্চহার, সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাল দশা—এসবই একসঙ্গে চেপে ধরেছে ব্রাজিলকে। বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস ২০টি শহরের তালিকায় ব্রাজিলেরই সাতটি শহর স্থান করে নিয়েছে। আর সঙ্গে আছে দূষিত হয়ে যাওয়া রাজনীতি, যা এ বিপাক থেকে সহজে মুক্তির কোনো আশ্বাস দিচ্ছে না। রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব বিচারেই এখন অসুখী একটি দেশের নাম ব্রাজিল।

দুর্দশাগ্রস্ত দেশটির মানুষ আশায় বুক বাঁধবে, সে সুযোগও তার সামনে নেই। কারণ রাজনীতি। এই রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বই পারে ব্রাজিলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সে আশাও দেখতে পারছে না ব্রাজিলবাসী। আগামী ৭ অক্টোবর ব্রাজিলের জাতীয় নির্বাচনের প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। আর দ্বিতীয় পর্ব হওয়ার কথা রয়েছে ২৮ অক্টোবর। বিভিন্ন জনমত জরিপের ফলাফল বলছে, এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ২৮ শতাংশ ভোটারের আস্থা অর্জন করে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন সোশ্যাল লিবারেল পার্টির (পিএসএল) প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জায়ের বোলসোনারো, যাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন সাও পাওলোর সাবেক মেয়র ও ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) প্রার্থী ফার্নান্দো হাদ্দাদ। দুজন সম্পূর্ণ দুই মেরুর। জায়ের বোলসোনারো কট্টর ডানপন্থী অবস্থান দিয়ে এরই মধ্যে ব্রাজিলের ট্রাম্প খেতাব পেয়েছেন। আর বামপন্থী ফার্নান্দো হাদ্দাদের বিষয়ে রয়েছে নানাবিধ বিতর্ক।

নির্বাচন ব্রাজিলের জনগণকে এক ভয়াবহ সমস্যার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাদের এখন বেছে নিতে হবে কম ক্ষতিকর একজনকে। এ কারণে অনেক ভোটারই নির্বাচনের বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন মতে, ব্রাজিলের ১৪ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের মধ্যে ১১ শতাংশ এরই মধ্যে নির্বাচনে ভোট না দেওয়া বা শূন্য ভোট দেওয়ার বিষয়ে স্থিরপ্রতিজ্ঞ। আরও ৫ শতাংশ ভোটার নিজেদের করণীয় নিয়ে ব্যাপক দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন।

জনমত জরিপের ফলাফল ও অধিকাংশ বিশ্লেষকের ভাষ্যমতে, আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পদে বোলসোনারোরই বসার সম্ভাবনা বেশি। কট্টর ডানপন্থী এই লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতিক ‘পরিত্রাণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও তাঁকে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আমেরিকার জন্য নতুন আপদ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সংকটটি হচ্ছে মূলত লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতি ও এর ক্রমবর্ধমান বিস্তারের। ব্রাজিলে বোলসোনারো ঠিক এই জায়গা থেকেই শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছেন। আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে এ ধারার রাজনীতির বিস্তার প্রথম দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। যদিও এর আগে থেকেই প্রবণতাটির শক্তি অনুভূত হচ্ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের উত্থানের পরপর ফিলিপাইনে রদ্রিগো দুতার্তে, ইতালিতে মাত্তেও সালভিনি ও মেক্সিকোয় আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজের নির্বাচিত হওয়া এই ধারার বিস্তারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এখন ব্রাজিলে বোলসোনারোর উত্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব নেতৃত্বে এই ধারা আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজনীতির মধ্যপন্থাটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। কারণ, যেসব দেশেই লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির জয় হয়েছে, সব কটি ক্ষেত্রেই হয় কট্টর ডান, নয়তো কট্টর বাম কোনো অংশ ক্ষমতায় বসছে।

বোলসোনারোকে লোকরঞ্জবাদী রাজনীতির উত্থানে সবচেয়ে বাজে একজন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকীটি বলছে, বোলসোনারো শুধু ব্রাজিল নয়, পুরো দক্ষিণ আমেরিকার গণতন্ত্রকেই হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারেন। এমন বিপর্যয় টেনে আনবার মতো যথেষ্ট রসদও রয়েছে তাঁর হাতে। সাধারণত লোকরঞ্জনবাদীরা নিজেদের উত্থানে সাধারণ জনগণের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কাজে লাগান। আর ব্রাজিলে এ রসদ বেশ ভালো মাত্রায় উপস্থিত।

ব্রাজিল বর্তমানে তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৪-১৬ সময়ের মধ্যে দেশটির মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ১০ শতাংশ কমেছে, যা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বেকারত্বের হার বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। সঙ্গে রয়েছে সমাজের অভিজাতদের লাগামহীন দুর্নীতি। এই সবই জনগণের ক্ষুব্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত ‘লাভা জাতো’। অর্থপাচার নিয়ে শুরু হওয়া তদন্তে একে একে ভয়াবহ সব তথ্য উঠে আসে। চলমান এ তদন্তে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের নাম উঠে এসেছে এ তদন্তে। ফলে, ব্রাজিলের জনগণের সামনে নির্বাচন এক প্রহসন হয়ে হাজির হয়েছে।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ অভিশংসিত হওয়ার পর দায়িত্ব নিয়েছিলেন মিশেল টিমার। কিন্তু তাঁকেও সেই পদ ছাড়তে হয় দুর্নীতির সংশ্লেষের অভিযোগে। বিচার এড়াতে সমঝোতার মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা ছাড়েন। আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা দুর্নীতির দায়ে এখন কারাগারে। এই অবস্থায় ব্রাজিলের জনগণ নিজের দেশের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনটি শব্দে ঘুরপাক খাচ্ছেন; যার কোনোটি প্রকৃতি, ফুটবল কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়। তাঁরা আওড়াচ্ছেন দুর্নীতি, লজ্জা ও হতাশা শব্দগুলো।

এই যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, ব্যর্থ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, আগা থেকে গোড়া অবধি ছড়ানো দুর্নীতি—এসবই মাঠ প্রস্তুতে সাহায্য করেছে বোলসোনারোকে। লাভা জাতোর আগ পর্যন্ত তিনি রিও ডি জেনিরো থেকে সাতবারের কংগ্রেস সদস্য হলেও তেমন পরিচিত ছিলেন না। মোটাদাগে আক্রমণাত্মক হিসেবে তাঁর বদনাম ছিল। নিজের এক সহকর্মী ও কংগ্রেস সদস্য সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘শুধু কুৎসিত বলেই তিনি তাঁকে ধর্ষণ করবেন না।’ সমকামিতার বিষয়েও তিনি ভীষণ আক্রমণাত্মক। এমন অসংখ্য ভয়াবহ মন্তব্য করেছেন তিনি, যা তাঁর জন্য কোনোভাবেই ইতিবাচক হওয়ার কথা নয়। কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল তা-ই হয়েছে। অনেকের কাছেই এসব অভব্য ও কুৎসিত মন্তব্য অন্য দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকের চেয়ে তাঁর আলাদা হওয়ার প্রমাণ হয়ে ধরা দিয়েছে। মূলত রাজনীতিসহ সর্বস্তরে দুর্নীতি যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটিয়েছে, তার থেকে মুক্তি পেতেই একটু আলাদা ধাঁচের কাউকে খুঁজছিল সাধারণ মানুষ। এখানেই হাজির হলেন বোলসোনারো। তিনি নিজের আক্রমণাত্মক ভঙ্গির সঙ্গে উদার অর্থনীতি, রক্ষণশীল খ্রিষ্টবাদ ও সামাজিক সংরক্ষণবাদিতা মিশিয়ে এক দারুণ ট্যাবলেট হাজির করলেন। অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পাওলো গুয়েদেসের পরামর্শে তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতি, বেসরকারিকরণ ও কর কাঠামো সহজীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে এক নতুন শুরুর আশ্বাস হাজির করেছেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ২৯ থেকে কমিয়ে ১৫ করা এবং এর কয়েকটিতে সামরিক কর্মকর্তাদের বসানোর পরিকল্পনা জানিয়ে সেনাবাহিনীকেও এক অর্থে তুষ্ট রেখেছেন তিনি। সঙ্গে গত মাসে হত্যাচেষ্টার শিকার হয়ে এক আশীর্বাদ পেয়েছেন তিনি, যা তাঁর জনপ্রিয়তার পালে জোর হাওয়ার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা থেকে আড়াল করার প্রয়াস দিয়েছে। ফলে নির্বাচনের প্রথম পর্ব বোলসোনারো বেশ ভালোভাবেই উতরে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্বে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শুধু ফার্নান্দো হাদ্দাদ থাকতে পারেন, যাঁকে বহন করতে হচ্ছে লুলা ডি সিলভার অজনপ্রিয়তার দায়।

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।