আজকের বার্তা | logo

৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং

কাজ করি মোরা, টাহা বেশি পায় পুরুষরা!

প্রকাশিত : মার্চ ০৮, ২০১৮, ১৫:১৯

কাজ করি মোরা, টাহা বেশি পায় পুরুষরা!

বরগুনা: ঘরে বাইরে যেহানেই যাই হেহিনেই পুরুষেরা বেশি গুরুত্ব পায়। মাটি কাটা থেকে শুরু করে দোকান দেওয়া বা কৃষি কাজ সব জায়গাতেই মোরা পুরুষের চাইতে বেশি কাজ করি হেরপরও হেরাই বেশি গুরুত্ব পায়। খালি গুরুত্বই না টাহাও বেশি পায় হ্যারা। সব কাজ করি মোরা, টাহা (টাকা) বেশি পায় পুরুষরা। এডা সমাজের রীতি হইয়া গেছে।’

এভাবেই আক্ষেপ করে নিজেদের অবহেলার কথা বলছিলেন বরগুনা সদর উপজেলার ভুতমারা গ্রামের গৃহীনি সবিতা রানী।

তিনি ঘরে বসে বাশ দিয়ে সাঁজি, চাটাই, কুলাসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের পণ্য উৎপাদন করেন। পুরো কাজটাই করেন তিনি।

শুধু সবিতা রানীই নন। বরগুনাসহ উপকূলে এভাবে হাজারো নারী শ্রমিক রয়েছে যারা কর্মক্ষেত্রে এখনো বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। দরিদ্র পিড়িত জনপদ বরগুনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে নারীরা ঘরের পাশাপাশি বাইরেও পুরুষের সাথে সমানতালে কাজ করছে। পুরুষের সমান কাজ করেও বরগুনাসহ উপকূলে নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠী, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কৃষি, জেলে, ব্যবসায় এমনকি দিনমজুরির কাজেও পুরুষের পাশাপাশি সমান ভূমিকা রাখছে নারী। তবুও পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ও সমাজ ব্যবস্থার কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের কুপ্রস্তাব দেয়ারও ঘটনা ঘটে। তবুও জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত নারী শ্রমিকরা এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এখনো এসব কর্মক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা কম মজুরি পেয়ে থাকেন। কিন্তু কোনো অংশেই পুরুষের চেয়ে কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই তারা।

স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারীর একটি কর্মশালায় উপস্থাপিত এক গবেষণার তথ্যে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ নারী শ্রমিক দৈনিক ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পেয়ে থাকেন এবং ৩২ শতাংশ দৈনিক ১০০ টাকার কম মজুরি পান। অন্যদিকে, ৫৬ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান।

বরগুনা সদর উপজেলাসহ পাথরঘাটা, বামনা, বেতাগী, আমতলী ও তালতলী ঘুরে উপকূলের নারী শ্রমিকদের এসব মজুরি বৈষম্যের চিত্র চোখে পরে। দেখা গেছে, আগের তুলনায় অনেক বেশি নারীরা কাজের জন্য ঘরের বাইরে যাচ্ছে। ঘরে ও বাইরে সমানতালে কাজ করছেন তারা। দিনমজুরিসহ জেলে, কৃষি ও হস্তশিল্প কাজে পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি ভূমিকা রাখছে। কিন্তু মজুরিতে রয়েছে বড় ধরনের তারতম্য। পণ্য বাজারজাতকরণ ও পরিবহণে সমস্যা, নিরাপত্তার অভাব, পারিবারিক বাধা এবং বাজার সম্পর্কিত তথ্য না পাওয়া তারা ন্যায্য পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। যেখানে নারীদের দৈনিক মজুরি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আর একই কাজের জন্য পুরুষদের দৈনিক মজুরি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। সেই সাথে রয়েছে নানাবিধ সুবিধা।

এ বিষয়ে কথা হয় বরগুনা সদর উপজেলার গৌরিচন্না ইউনিয়নের শেফালী বেগমের সাথে। তিনি পেশায় একজন দিনমজুর।

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন রাস্তায় কাম (কাজ) করি ১৫০ টাকা করে মজুরি পাই, অন্যদিকে একই কাজ করে ২০০-২৫০ টাকা করে পান পুরুষরা।’

একই ইউনিয়নের দরিদ্র বিধবা হাসি বেগম স্বামীহীন সংসারের ভরণ পোষনের জন্য সারাদিন জাল নিয়ে পরে থাকেন বিষখালী নদীতে। মৎস্য শিকার করে চালান সংসারের সকলের ভরনপোষন।

তিনি বলেন, ‘সারাদিন মাছ ধরি ঠিকই কিন্তু বেচতে (বিক্রি) গেলে দাম পাই না। বাজারো কোনো মাছ কি রহম বিক্রি হয় কইতে পারি না। বাজার সম্পর্কে যদি মোরা একটু ধারনা পাইতাম হেলে হয়তো এই মাছই আরো বেশি টাহায় বিক্রি করতে পারতাম।’

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেই সাথে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে নারী। কিন্তু এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজে গ্রামীন অনেক নারীকে ঘরের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। তাই হস্তশিল্পের সাথে জড়িত সকল নারী শ্রমিকদের উৎপাদিত পন্য বিক্রি করতে হচ্ছে পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরকে দিয়ে।

বরগুনা সদর উপজেলার সোনাতলা গ্রামের নাসিমা বেগম একজন সফল কৃষক কিন্তু তার উৎপাদিত পন্য তিনি কখনো বিক্রি করতে পারেননি। কয় টাকা ব্যায়ে কয় টাকা লাভ হলো তা এখনো তার অজানা। তার স্বামী তার সকল উৎপাদিত শাক সব্জি বিক্রি করেন নিয়ে হাটে।

নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমাদের জন্য নির্ধারিত কোনো বাজার নেই, পন্য পরিবহনেও আমাদের অনেক অসুবিধা হয়। তাই আমাদের সংসারের পুরুষ সদস্যরা আমাদের পন্য বাজারে বিক্রি করে।’

সম্প্রতি একটি নারী কৃষানী বাজার হয়েছে আমরা আশাবাদী এখানে আমরা আমাদের পন্য বিক্রি করতে পারবো বলেও জানান তিনি।

বরগুনাসহ উপকূলীয় নারী শ্রমিকদের মজুরি তারতম্যের বিষয়ে বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের দেশের নারীরা পুরুষের সাথে সাথে এখন সমান তালে কাজ করছে। কিন্তু অত্যন্ত দু:খজনক ব্যপার হচ্ছে নারীরা এখনো মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তাই নারী শ্রমিকদের জন্য জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হলে এই বৈষম্য অনেকটাই কমে যাবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য বাজারজাতকরণ, উপার্জিত অর্থব্যয়ের ক্ষমতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান এবং প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করলে নারীরাও আরো সচেতন হবে।’

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন নাগরিক অধিকারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান তারিক পলাশ বলেন, ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার নারীর ভাগ্যোন্নয়নে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা শিক্ষার হার কম থাকায় ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উপকূলীয় নারীদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলে আগামী দিনে এই বৈষম্যের শিকার হতে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবেন তারা।’

নারীদের মজুরি বৈষম্য ও নারী অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন জাগোনারী।

এ বিষয়ে জাগোনারীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসেনেয়ারা হাসি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করছি। নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হন এটা আমাদের কাছে পরিলক্ষিত। তাই আমরা প্রাথমিক ভাবে নারীরা যাতে তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক পায় তার জন্য কৃষাণী বাজারের সূচনা করেছি।

তিনি আরো বলেন, ‘আগে নারীরা ঘরের বাইরে কাজে যেত না, সেটা এখন নেই বললেই চলে। তবে এখনো ন্যায্য মজুরি থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে তবে এ সমস্যাও নিরসন হবে।’

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।