আজকের বার্তা | logo

৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং

ভারতবর্ষ ও ইসলাম!

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮, ১০:৩৯

ভারতবর্ষ ও ইসলাম!

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান: বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সুরজিৎ দাশগুপ্ত ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ নামে যে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি রচনা করেন, তা কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। তিনি ভারতবর্ষে মুসলিম আগমন এবং সমাজজীবনে তার প্রভাব ও কারণ বিষয়ে নতুন কিছু তথ্য উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া কিছু পুরনো তথ্যেও তিনি নতুনত্ব দান করেন বিশ্লেষণের বিশিষ্টতা দিয়ে। প্রথমেই ভারতবর্ষে মুসলিমদের জনসংখ্যা তথ্যের একটি রিপোর্ট থেকে তিনি মন্তব্য করেন : … ‘ব্যাপারটা বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে যে যখন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের হাতে সত্যই অনেক শক্তি ছিল, তখন ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যায় লঘু ছিল।’ [সুরজিৎ দাশগুপ্ত : ভারতবর্ষ ও ইসলাম, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৮৮]

অর্থাৎ মুসলিমরা যখন ভারতবর্ষে ক্ষমতায় ছিল, তখন মুসলিম জনগোষ্ঠীরই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকার কথা ছিল। কিন্তু ভারতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে তখন, যখন মুসলিমরা ক্ষমতায় নেই। তিনি লক্ষ করেছেন, যখন বাংলার শহরাঞ্চলে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা এক নতুন উত্থান ও জাগরণের চেতনায় গৌরবে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল, সেই ঘটনার কালেই গ্রামাঞ্চলে বাঙালি মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার গৌরব অর্জন করে। অর্থাৎ বাংলায় শহরে হিন্দুরা আর গ্রামে মুসলিমরা বাড়ছিল। এ প্রসঙ্গে ‘তলোয়ারের জোরে’, ‘বলপ্রয়োগে’ ইসলাম প্রচারের তত্ত্ব, যা এতকাল ভারতবর্ষে একদল অপইতিহাসবিদ দ্বারা প্রচারিত হয়ে আসছে, সে সম্পর্কেও তিনি কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন : ‘প্রথমেই আসে বলপ্রয়োগে ধর্ম প্রচারের তাৎপর্য। হৃদয়ঙ্গমের প্রশ্ন। যদি অস্ত্রের সাহায্যেই বা বলপ্রয়োগেই ইসলাম ধর্ম প্রচার হয়ে থাকে, তাহলে মুসলিম শক্তির প্রধান কেন্দ্র থেকে এত দূরে বাংলায়ই ইসলাম ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করল কী করে? বলপ্রয়োগে ধর্ম প্রচারের তত্ত্ব সত্য হলে মুসলিম শক্তির প্রধান কেন্দ্র দিল্লির সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে ইসলামের অধিকতর প্রতিষ্ঠা হওয়াই উচিত ছিল নাকি? বাংলার ক্ষেত্রে গৌড় ও ঢাকার শহরাঞ্চলেই ইসলামের জনপ্রিয় হওয়ার কথা নয় কি? কিন্তু কার্যত তা হয়নি।’ [সুরজিৎ দাশগুপ্ত : ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৮-৮৯]

তিনি আরো যুক্তি তুলে ধরে বলেন : ‘অনেকে মনে করেন, নবাব-সুলতানদের দরবারে ও দপ্তরে উচ্চ পদ পাওয়ার লোভেই জনসাধারণের একটা অংশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এটাই যদি সত্য হয়, তাহলে দিল্লির সংলগ্ন অঞ্চলেই মুসলিমদের সংখ্যা বেশি হওয়া উচিত, কেননা সেখানেই উচ্চ পদের সংখ্যা ছিল ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সুতরাং উচ্চ পদের প্রলোভন ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রধান কারণ হতে পারে না।’ [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৯]

এ প্রসঙ্গে লেখক ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য এবং অভিমতও তুলে ধরেন, যেখানে সুনীতি কুমার বলেছেন, ‘অস্ত্রশক্তিতে যেভাবে ভারতীয়রা ধর্ম-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করতে সমর্থ হয়েছে, প্রেমশক্তিকে (ইসলামের সাম্য ও ভালোবাসার শক্তি—গবেষক) সেভাবে প্রতিরোধ করতে পারেনি। সুরজিৎ দাশগুপ্ত ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের বাংলাদেশের ইতিহাসগ্রন্থও উদ্ধৃত করেন, সেখানে মজুমদার সিদ্ধান্ত টেনেছেন এই বলে যে ‘উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নির্যাতন করত, তাই নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ব্রাহ্মণের অত্যাচার থেকে অব্যাহতির আশায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।’ সুরজিৎ দাশগুপ্ত অবশেষে নিজস্ব মন্তব্য প্রসঙ্গান্তরে উল্লেখ করে বলেন, ‘হিন্দু নেতারা নিজেদের ধর্মকে যতটা উদার ধর্ম বলে প্রচার করেন, হিন্দু ধর্ম যে সত্যই ততটা উদার নয়, এর উদারতা যে বহুলাংশে প্রচারসর্বস্ব, তার প্রমাণ নিম্নবর্ণের প্রতি উচ্চবর্ণের আচরণেই মেলে’। [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৯-৯০]

সুরজিৎ দাশগুপ্ত বাংলায় ‘মুসলিম’ বিজয়ের (প্রকৃতপক্ষে এখানে বলা উচিত ছিল বাংলায় তুর্কি বিজয়, কারণ তুর্কিরা মুসলিম হলেও ইসলাম প্রচার তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল না, তারা এসেছিল রাজ্য শাসন করতে, এর সঙ্গে ইসলাম প্রচারের কোনো সম্পর্ক নেই—গবেষক) তিনটি কারণ উদ্ঘাটন করেছেন। এর মধ্যে একটি ছিল সংঘশক্তির অভাব; দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সমর্থক রাজশক্তির প্রতি দেশীয় জনগণের নেতিবাচক মনোভাব; তৃতীয়ত, জনগণের স্বাতন্ত্র্যপ্রিয়তা। [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯৫]

তবে প্রাচীন বাংলায় মুসলিম আগমনের সময় নির্ধারণেও দাশগুপ্তকে মননশীল দেখি! তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছেন যে “পশ্চিমবঙ্গে যখন ‘মুসলিম’ বিজয় হয়, সম্ভবত তার আগে থেকেই পূর্ববঙ্গের জনসাধারণ মুসলিমদের সংস্পর্শে এসেছিল।”  [ভারতবর্ষ ও  ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯৫]

বরাবর ইতিহাসবিদদের আমরা এ ভ্রান্তিতে পাই যে তাঁরা বাংলায় ইসলাম আগমনের বিষয়টি তুর্কি সমরনেতা বখতিয়ার খলজির আগমনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কেউ কেউ হালকা করে অবশ্য বলেন, তুর্কিদের আগে কিছু কিছু সুফি বাংলায় ইসলাম প্রচার করেছিলেন। এ মন্তব্যও ভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ। কারণ সুফিরা এসেছিলেন ইরান-পারস্য অথবা মধ্যএশিয়া থেকে। কিন্তু বাংলায় ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগেই যে আরবরা এসেছিল, সে সম্পর্কে ইতিহাসবিদরা বস্তুত অন্ধকারেই আছেন। সে জন্য সুরজিৎ দাশগুপ্তের এ মন্তব্য গভীর তাৎপর্য বহন করে যে পশ্চিমবঙ্গে ‘মুসলিম’ বিজয়ের আগেই পূর্ববঙ্গ ইসলামের ছোঁয়া পেয়ে গিয়েছিল। দাশগুপ্ত এ প্রসঙ্গটির পটভূমি ও কার্যকারণ আরো বিস্তারিত করেন : ‘পশ্চিমবঙ্গে যখন মুসলিম বিজয় হয়, সম্ভবত তার আগে থেকেই পূর্ববঙ্গের জনসাধারণ মুসলিমদের সংস্পর্শে এসেছিল। আরব বণিকরা বা মূলত শেখ সম্প্রদায় যুদ্ধবিগ্রহ বা রাজ্য জয়ের চেয়ে বাণিজ্যিক তৎপরতায় অধিক আগ্রহী ছিল—তারা যেমন আরব সাগরবর্তী বিভিন্ন ভারতীয় বন্দরে ও সিংহলে পত্তনি পেতেছিল, তেমনই বঙ্গোপসাগর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পথে চট্টগ্রাম বন্দরে ঘাঁটি গড়ে তোলে।’ [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯৫]

সুরজিৎ দাশগুপ্তের এ অনুসন্ধান সঠিক রয়েছে, তবে আরব বণিক সম্পর্কিত মন্তব্যটি তাদের ‘মুসলিম’ পরিচয়ের আগের। যখন আরব বণিকরা মোহাম্মদ (সা.)-এর আমলের পর মুসলিম হয়ে গেল—১. তখন তারা ‘বাণিজ্যিক তৎপরতায়’ অধিক আগ্রহী ছিল না, ২. তখন তারা ‘সাহাবি’ [মোহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গ লাভকারী সাথি] পরিচয় পেয়ে গেছেন, ৩. তখন তারা ইসলাম প্রচারকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

আরব-বাংলা-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্কটির কথা সীমিত আকারে হলেও সবারই জানা। কিন্তু পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) সাধারণ মানুষদের সমুদ্রযাত্রা থেকেও বিরত রাখা হয়েছিল, এটি ব্রাহ্মণ নিপীড়নের ইতিহাস আলোচনায় খুব বেশি রাখা হয়নি। দাশগুপ্ত জানাচ্ছেন : ‘আস্তে আস্তে হিন্দু বণিকদের কাছে আরব বণিকরা স্বীকৃতি পেল। সমাজপতিদের ভয়ে যারা ঘরের কোণে জীবন্মৃত অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করছিল, তাদের ওই আরবরা ডাকল সমুদ্রে; আশ্বাস দিল, সাহস দিল, জোগাল নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা, দিল নতুন ধর্মের আশ্রয়, দিল আত্মবিস্তার ও আত্মবিশ্বাসের অধিকার, সামাজিক স্বীকৃতি ও সক্ষমতার প্রতিশ্রুতি। যাদের রক্তে ছিল পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত সমুদ্রের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ, তারা পরম উৎসাহে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল কাতারে কাতারে।’ [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯৫-৯৬]।

সুরজিৎ দাশগুপ্ত আরো একটি নতুন বিষয় তাঁর অভিসন্দর্ভে উল্লেখ করেছেন, তা হলো—‘পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে তুর্কি, আফগান, পাঠান ও মুঘল রক্তের যতটা সংমিশ্রণ হয়েছে, পূর্ববঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের ততটা হয়নি’। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে যদি বিদেশি রক্তের অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে, তাহলে তা আরব্য রক্তে হয়েছে। তবে তাঁর বিশ্বাস, আরব-রক্ত পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে ‘খুব অল্প পরিমাণেই হয়েছে, কেননা সেখানে আরবের শেখরা স্থায়ীভাবে বসবাস করেনি, রাজত্বও করেনি।’ ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯৬]

দাশগুপ্তের এই শেষ মন্তব্যটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আর সেটি এই যে আরবরা এ দেশে রাজত্ব করেনি। কারণ আমরা যে প্রচারক মুসলমান ও শাসক মুসলমান দুটি আলাদা চরিত্রের কথা বলছি, তার মৌলিক কথাটি এখানে নিহিত রয়েছে। আরব দেশ থেকে বণিক বা যারাই এ দেশে এসেছিল, তারা মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের আগে ব্যবসা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এসেছিল, মুহাম্মদ (সা.) যখন ইসলামের বার্তা নিয়ে এলেন, তখন আরবরা আর প্রধানভাবে ব্যবসা নয়, এসেছিল ইসলাম প্রচারের দাওয়াতি কাজে। তাই সৈন্য-সামন্ত, যুদ্ধ, রাজ্যজয় ইত্যাদি ঘটনা তাদের থেকে এ দেশে ঘটেনি। তাঁরা ইসলামের মর্মবাণী মেহনত করে ঘরে ঘরে, দ্বারে দ্বারে গিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। আর এভাবেই বাংলার জমিন ইসলামী শক্তিতে ভরপুর হয়ে উঠেছিল। তুর্কিরা এসেছিল শাসন করতে, যুদ্ধ তাদের করতেই হতো; কিন্তু করতে হলো না। কারণ সাধারণ মানুষ তত দিনে ইসলামপন্থা গ্রহণ করে নিয়েছিল। স্থানীয় রাজা হয়ে পড়েছিলেন জনবিচ্ছিন্ন, ফলে পালিয়েই তিনি বেঁচে গেলেন। তুর্কিরা অনেকটা প্রবাদ বাক্যের ‘ফাঁকা মাঠে গোল’ দিয়ে ‘বীর’ হয়ে গেল।

সুরজিৎ দাশগুপ্তের আরো একটি পর্যবেক্ষণ আলোচনার দাবি রাখে। তিনি দেখেছেন, পূর্ববঙ্গে ও পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম একইভাবে বিকশিত হয়নি। মানুষের শ্রেণি-চেতনার মধ্যেও স্পষ্ট পার্থক্য ছিল এ দুই বঙ্গে। তিনি লিখেছেন : ‘হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে যে একাধিক সুস্পষ্ট বিভেদ ছিল, এ কথা অস্বীকারের প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু এই বিভেদ উচ্চ শ্রেণির মধ্যে ও বড় বড় জনপদে যতখানি ছিল, গ্রামাঞ্চলের শ্রমজীবী বা নিম্নশ্রেণির বৃহত্তর জনসাধারণের মধ্যে ততখানি ছিল না; বরং পূর্ববঙ্গের শ্রমজীবীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ভাবটাই ছিল প্রবল এবং বলপ্রয়োগে ইসলাম ধর্ম প্রচারের চেষ্টাও সেখানে কম হয়েছিল, সুতরাং উত্পীড়ক হিসেবে মুসলিমের রূপটাও সেখানকার তৎকালীন লোক-অভিজ্ঞতায় ছিল অস্পষ্ট অথবা অবাস্তব। তুর্কি পাঠানদের সম্পর্কে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা পশ্চিমবঙ্গবাসীদের রচনায়ই সীমাবদ্ধ, পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে অত্যাচারী মুসলিম শাসক অনুপস্থিত। উভয় বঙ্গের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলায় ইসলামের প্রভাব ও তার প্রতিক্রিয়া একভাবে, এক রেখায় ও এক ধারায় বিবর্তিত হয়নি।’ [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১০০]

এভাবে ইসলাম তো বাংলায় প্রবেশ করল, কিন্তু ইসলাম থেকে বাংলার মানুষ কী পেল। তার সূত্রায়ণ করেছেন ইতিহাসবিদ দাশগুপ্ত। তিনি বলেছেন :

১. ইসলাম স্বাতন্ত্র্যে গৌরবান্বিত বাংলার জনসাধারণকে অজ্ঞাতপূর্ব মুক্তির স্বাদ দিল।

২. বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণির তথা শ্রমজীবী জনসাধারণকে দিল ব্রাহ্মণ্য নির্যাতন ও কঠোর অনুশাসনাদি থেকে মুক্তি।

৩. প্রতি পদে সামাজিক অপমান থেকে মুক্তি।

৪. পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গের সমুদ্রস্পৃহ জনসাধারণকে দিল ভৌগোলিক বিধিনিষেধের বন্দিদশা থেকে মুক্তি।

৫. বহু আয়াসসাধ্য সংস্কৃত ভাষার বন্ধন কেটে জনসাধারণকে দিল মাতৃভাষায় আত্মপ্রকাশের অধিকার।

৬. সাহিত্যের বাহনের মতোই প্রসঙ্গ বা বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও দিল ধর্মীয় বন্ধন থেকে মানবিক প্রসঙ্গে মুক্তি।

৭. বাংলার বহু সাধনাত্মক ইতিহাসকে ইসলাম যে ধ্রুবপদে বেঁধে দিল তার নাম স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা। [ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১০০]

প্রকৃতপক্ষে বাংলায় মুসলিম নামবিশিষ্ট কোনো শাসকের সাম্রাজ্য বিস্তারের আগেই এ দেশে, বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) ইসলাম নিজস্ব মর্যাদায় সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামটি মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশা থেকে শুরু হয়ে বারো শতক পর্যন্ত তুর্কিদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত কোনোরূপ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই সমাজ-মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ও গ্রহণীয় হয়ে ওঠে। সুরজিৎ দাশগুপ্ত এ দেশের বিরল এক ইতিহাসবিদ, যিনি এ ঘটনাগুলো নির্মোহ ও নিরাবেগ এক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, যেখানে মুসলিম ঐতিহাসিকদেরও অবজ্ঞা ও অজ্ঞতা আমরা লক্ষ করি।

গ্রন্থনা : বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।