আজকের বার্তা | logo

৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং

বরিশালের প্রথম শহীদ মিনার

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮, ২০:৩০

বরিশালের প্রথম শহীদ মিনার

শহরের অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিলো ১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন শহীদ মিনারে শোকের প্রতীক কালো পতাকা এবং সংগ্রামের প্রতীক লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিলো। এর আগে জনৈক মোহাম্মদ সুলতান তার দোকানের ১০গজ সাদা কাপড় দিয়ে শহীদ মিনার মুড়ে দিয়েছিলেন। পুষ্পস্তবক দিয়ে বরিশাল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবুল হাশেম শহীদ মিনারের উদ্বোধণ করেন। পরবর্তীতে ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে সরকারী নির্দেশে পুলিশ ওই শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলেছিলো।

 

জীবিত থাকাকালীন বরিশালের কয়েকজন ভাষা সৈনিকের স্মৃতিচারণ ও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস’ গ্রন্থ সূত্রে জানা গেছে, ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগ্রাম শুরু হওয়ার পূর্বে ১৯৪৮ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে শেখ মুজিবুর রহমান বরিশালে এসে বিএম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে সভা করে ছাত্রদের সংগঠিত করেন। শেখ মুজিবুর রহমান বরিশালে সভা করে ঢাকায় যাওয়ার পর বাংলা ভাষার দাবিতে প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট করে সেক্রেটারিয়েট ঘেরাও করা হয়। ওইদিন শেখ মুজিবুর রহমানসহ বরিশালের গৌরনদী থানার কাজী গোলাম মাহবুব, সরদার ফজলুল কবির গ্রেফতার হন।

 

পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার এক জনসভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার পর পরই এর প্রতিবাদে বিভিন্ন দলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। ২৮ সদস্য বিশিষ্ট ওই কর্মপরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন বরিশালের কৃতী সন্তান কাজী গোলাম মাহবুব। এ ছাড়া ওই কমিটিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বরিশালের আরও পাঁচজন। ফলে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার উত্তাপ বরিশালেও ছড়িয়ে পরে। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহবানে বরিশালে ‘২১ ফেব্রুয়ারি’ পালনের প্রস্তুতি চলে। আওয়ামী মুসলিম লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ‘পতাকাদিবস’ পালন শুরু হয়। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এ নামে পতাকা ও ব্যাজ বিতরণ এবং পোস্টারিং চলতে থাকে। কর্মীরা টিনের চোঙা নিয়ে রাস্তায় প্রচারকাজ চালায়। ওই চোঙা ফুকানোর অন্যতম নায়ক ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নিখিল সেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল মালেক খানকে সভাপতি এবং যুবলীগের সম্পাদক আবুল হাশেমকে আহ্বায়ক করে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট ‘বরিশাল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠণ করা হয়। বরিশাল যুবলীগের সভাপতি আলী আশরাফ ছিলেন সংগ্রাম পরিষদের অবিসংবাদিত নেতা।

 

বরিশালে ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিএম কলেজের ছাত্ররা ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। তারা পৃথক ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠণ করেন। এর আহ্বায়ক ছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি এবং বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট গৌরনদীর সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া।

 

২১ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর বরিশালের সব বিদ্যালয় ও শহরে হরতাল পালিত হয়। মিছিল বরিশাল শহর প্রদক্ষিণ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদ বরিশালে পৌঁছে। একজন পুলিশ সদস্য রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দকে তা জানিয়েছিলেন। ফলে পরিষদের উদ্যোগে রাত নয়টায় শহরে মিছিল বের করা হয়। ওই রাতেই সার্কিট হাউসের কাছে অবস্থিত বরিশাল মুসলিম ইনস্টিটিউটে সংগ্রাম পরিষদের জরুরি সভা বসে পরবর্তী কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়। সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সংখ্যা ২৫ থেকে ৮১ জনে উন্নীত করা হয়।

 

২১ ফেব্রুয়ারি সারা রাতেই ছাত্রদের প্রচারকাজ চলে। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশালে হরতাল ও মিছিল হয়। অন্যান্য স্থানের মতো বরিশালেও আন্দোলনকে সংগঠিত করার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। ওইদিন অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে ভোর থেকেই ছাত্র ও জনতার ¯্রােত নামে। গ্রাম থেকে আসা জনতা ছাড়াও শহরের শত শত নারীদের নেতৃত্বে প্রথম শোভাযাত্রা বের করা হয়। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন মেয়েরা, তার পরে সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। স্মরণকালের বৃহত্তম মৌন মিছিল অশ্বিনী কুমার টাউন হল থেকে বের হয়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে সার্কিট হাউস ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী খান বাহাদুর হাশেম আলী, অ্যাডভোকেট শামসের আলী নগ্নপদে মৌন মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ওইদিন অনেক মুসলিম লীগ নেতাকর্মী দল ত্যাগ করেন। সংগ্রামী জনতার এক জনসভা ওইদিন বিকেল তিনটায় অশ্বিনী কুমার টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় একে স্কুল মাঠে শহীদ ছাত্রদের গায়েবানা জানাজা শেষে ছাত্র ও জনতা শোক র‌্যালী বের করে শহর প্রদক্ষিণ করে অশ্বিনী কুমার টাউন হল চত্বরে সমবেত হন। সেখানে একেএম আজহার উদ্দিনের সভাপতিত্বে এক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়।

 

বরিশালের গৌরব শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করেন এবং শহীদ মিনার নির্মাণ ও বাংলা ভাষাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। বরিশালের সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এসব গৃহীত প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।