আজকের বার্তা | logo

১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং

বরিশালের একটি গ্রাম ছয় বছর ধরে পুরুষ শুন্য, বাড়িতে ফিরলেই খুন!

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৮, ১০:৫০

বরিশালের একটি গ্রাম ছয় বছর ধরে পুরুষ শুন্য, বাড়িতে ফিরলেই খুন!

অনলাইন ডেক্সঃ এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে স্থানীয় থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে প্রভাবশালী এক আইনজীবী ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীদের একের পর এক হামলা, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, লুটপাট, পরিকল্পিত হত্যাকান্ড, অপহরণসহ মিথ্যে মামলা দিয়ে হয়রানীর কারণে ছয় বছর ধরে পুরুষ শুন্য রয়েছে একটি গ্রাম।

 

সর্বশেষ বাড়িতে স্থায়ী বসবাস করায় ৬৫ বছরের এক বৃদ্ধকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে খুনীদের ছবিসহ ফাঁসির দাবিতে ব্যাপক পোস্টারিং করা হলেও টনগ নড়েনি পুলিশ প্রশাসনের। হত্যা মামলার এজাহারভূক্ত আসামিদের গ্রেফতার না করে উল্টো রহস্যজনক কারণে আসামিদের পক্ষালম্বন করে থানা পুলিশ স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ একাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে। পরবর্তীতে হত্যা মামলার আসামিদের দিয়ে পুলিশ একাধিক মিথ্যে মামলা দায়ের করিয়ে ওইসব মামলায় আটককৃতদের এজাহারভূক্ত আসামি দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। সেইসব মিথ্যে মামলায় এখনও কারাভোগ করছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ একাধিক নিরিহ গ্রামবাসী। এসব ঘটনার তদন্তে এবার মাঠে নেমেছেন সিআইডির স্পেশাল টিম। ঘটনাটি জেলার মুলাদী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বের বাটামারা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত টুমচর গ্রামের।

 

সরেজমিন ঘুরে ভূক্তভোগীদের সাথে আলাপকরে জানা গেছে, প্রভাবশালী এক আইনজীবী ও তার ভাতিজা পাশ্ববর্তী জেলার এক ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগীতায় এককভাবে প্রভাব বিস্তারের জন্য সন্ত্রাসী বাহিনী গঠণ করে দীর্ঘদিন থেকে ওই এলাকায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। তারা নিরিহ গ্রামবাসীর ওপর একের পর এক হামলা, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, লুটপাট, পরিকল্পিত হত্যাকান্ড, অপহরণসহ মিথ্যে মামলা দিয়ে হয়রানী করায় দীর্ঘ ছয় বছর ধরে পুরো এলাকাটি পুরুষ শুন্য হয়ে পরেছে।

 

ওই এলাকার হাজ্বী দুলাল মাতুব্বর, মনির বেপারী, মোকসেদ তালুকদার, আলী হোসেনসহ একাধিক বক্তিরা জানান, একই গ্রামের বাসিন্দা বরিশাল জেলা উত্তর বিএনপির প্রভাবশালী সদস্য (বর্তমানে বহিঃস্কৃত) ও আইনজীবী মজিবুর রহমান দুলাল এবং তার ভাতিজা তারিকুল হাসান পলাশ দীর্ঘদিন থেকে সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে এলাকার একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। তাদের সহযোগী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে সবধরনের অপকর্ম করে আসলেও মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে দেয়ার ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়না। গত ছয় বছর ধরে প্রভাবশালীদের হামলা ও মামলার ভয়ে ওই গ্রামের অধিকাংশ যুবক ও কিশোর নিজ গ্রাম ছেড়ে দেশের বিভিন্নস্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। সন্ত্রাসীদের হাতে সম্ভ্রব্য হারানোর ভয়ে গ্রামের যুবতীরাও অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এ সুযোগে থানা পুলিশের সাথে আতাত করে সন্ত্রাসীরা নিরবে নিরিহ গ্রামবাসীর কাছ থেকে চাঁদাবাজি, প্রকাশ্যে বাড়ি ঘরে হামলা চালিয়ে গবাদি পশুসহ মূল্যবান মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে।

 

স্থানীয় আব্বাস বেপারী জানান, পুরুষশুন্য ওই গ্রামে সম্প্রতি সময়ে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আকবর হাওলাদার। তিনি আরও জানান, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য তারা ৭/৮জন যুবক ঢাকা থেকে গত ৩১ ডিসেম্বর বাড়িতে আসেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রভাবশালীরা থানা পুলিশের মাধ্যমে তাকে (আব্বাস বেপারী)সহ স্থানীয় ইউপি সদস্য আলমগীর হাওলাদার, মনির বেপারী ও হাজী দুলাল মাতুব্বরকে কোন মামলা ছাড়াই আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ওইদিন (৩১ ডিসেম্বর) মধ্যরাত পর্যন্ত স্থানীয় আজাহার মোল্লার বাড়িতে থানার এক এসআই’র উপস্থিতিতে গোপন বৈঠক চলে। পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে এলাকায় আতংক সৃষ্টির জন্য সন্ত্রাসীরা স্থায়ী বসবাস করা ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আকবর বেপারীর বাড়িতে একাধিক বোমার বিস্ফোরন ঘটিয়ে বসত ঘর ভেঙ্গে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্রদিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে আকবর হাওলাদারকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। একইদিন রাতে সন্ত্রাসীরা মনির বেপারী, হাজী দুলাল মাতুব্বর, সালাম মাতুব্বর, মোকসেদ তালুকদার, আলমগীর হাওলাদার, রাজ্জাক হাওলাদার, আলী হোসেন হাওলাদারের বসত ঘর ও একটি ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে ব্যাপক লুটপাট করে।

 

আব্বাস বেপারী আরও জানান, পরেরদিন (১ জানুয়ারি) প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের এক সহযোগীর দায়ের করা একটি সাজানো মিথ্যে মামলায় তাদের (আটককৃত) চারজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করে পুলিশ।

 

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহত আকবর হাওলাদারের স্ত্রী সিরিয়া বেগম ও মেয়ে সুমা বেগম নৃশংস হত্যাকান্ডের বর্ণনা করতে গিয়ে বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বিলাপ করে বলেন, দুলাল উকিলের ভাতিজা তারিকুল হাসান পলাশের নেতৃত্বে ৩০/৩৫জন সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আমাদের চোখের সামনে বসেই কুপিয়ে (আকবর হাওলাদারকে) হত্যা করেছে। নিহতের স্ত্রী সিরিয়া বেগম অভিযোগ করেন, স্থানীয় গ্রামপুলিশ মন্টু চৌকিদার নিহত আকবর হাওলাদারের লাশ গুম করার জন্য একাধিকবার চেষ্ঠা চালিয়েছে। কিন্তু তিনি তার মৃত স্বামীর পায়ের সাথে নিজের পরিহিত কাপরের একাংশ দিয়ে বেঁধে রাখার কারণে লাশ গুম করতে পারেনি।

 

নিহতের পুত্র ও মামলার বাদি দিদার হাওলাদার জানান, খবর পেয়ে তিনি ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরে গত ৩ জানুয়ারি মজিবুর রহমান দুলাল, তারিকুল হাসান পলাশসহ ২১জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০/১২জনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়েরের জন্য এজাহার দাখিল করেন। রহস্যজনক কারণে থানা পুলিশ একটি সাদা কাগজে তার স্বাক্ষর নিয়ে মামলার প্রধান সাত আসামির নাম বাদ দিয়ে এজাহারভূক্ত করেন। তিনি আরও জানান, থানা পুলিশ মামলার প্রধান আসামিদের নাম বাদ দেয়ায় তিনি পূর্ণরায় ওইসব আসামিদের নাম অর্ন্তভূক্ত করে আদালতে মামলা দায়েরের জন্য আবেদন করেছেন। ঘটনার প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও হত্যা মামলায় পুলিশ রহস্যজনক কারণে অদ্যবর্ধি এজাহারভূক্ত কোন আসামিকে গ্রেফতার করেননি। উল্টো একই তারিখে আসামি পক্ষের দায়ের করা দুটি সাজানো মিথ্যে মামলায় পুলিশ স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ নিরিহ গ্রামবাসীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছেন। এমনকি হত্যা মামলাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য প্রভাবশালী সন্ত্রাসীরা ওই এলাকার এক প্রতিবন্ধী যুবককে হত্যা করার জন্য মিশনে নামেন। যার রহস্য ফাঁস হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

 

এসব ঘটনার তদন্তে এবার মাঠে নেমেছেন সিআইডির স্পেশাল টিম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির স্পেশাল টিমের দায়িত্বশীয় এক কর্মকর্তা সরেজমিনে বসে সাংবাদিকদের জানান, হেড কোয়ার্টারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে চাঞ্চল্যকর আকবর হাওলাদারের হত্যাকান্ড, পাশ্ববর্তী উত্তর বালিয়াতলী গ্রামের ৩০টি পরিবারের বসত ঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, ডাকাত সর্দার আনিসুর রহমান এবং তার সহযোগী সফিপুর এলাকার রিপন সরদারের হত্যাকান্ড, বালিয়াতলী গ্রামের দিনমজুর আলমগীর কবিরাজকে উলঙ্গ করে হাতুরি পেটার ঘটনায় তারা মাঠে কাজ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে তারা সন্দেহভাজনদের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের মোবাইল ট্যাকিং করেছেন। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এসব ঘটনায় থানা পুলিশের নিরব ভূমিকা পালন ও প্রতিটি ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালী একই ব্যক্তিরা জড়িত রয়েছেন বলে একাধিক প্রমান মিলেছে।

 

ভূক্তভোগী এলাকাবাসী সঠিক তদন্তের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর আকবর হাওলাদারের প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেফতারপূর্বক ফাঁসির দাবি ও এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। সূত্রঃ এফএনএস

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।