আজকের বার্তা | logo

৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং

শিশুশিক্ষা : অভিভাবকের করণীয়

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২১, ২০১৮, ১১:৩১

শিশুশিক্ষা : অভিভাবকের করণীয়

মুফতি শরীফুল আজম: সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে তাদের যথাযথ শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা অভিভাবকের অন্যতম একটি গুরুদায়িত্ব। বলতে গেলে এটি একজন সফল মানুষের জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। মূলত মা-বাবার ওপরই এ মহান দায়িত্ব বর্তায়। সন্তানকে মানুষ করার মুখ্য ভূমিকা তাঁদেরই। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে : পুরুষ তার পরিবারের পরিচালক ও তাকে এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। আর নারী তার স্বামীর সংসার দেখভালের দায়িত্বশীল এবং এ ব্যাপারে তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে। (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩, মুসলিম, হাদিস : ৪৭২৪)

অন্য হাদিসে এসেছে : সন্তানদের তোমরা আদব শেখাও ও উত্তম দীক্ষা দাও। (ইবনে মাজাহ)

পিতার দায়িত্ব

এক ব্যক্তি হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে নিজ সন্তানের ব্যাপারে নালিশ করল, ছেলে কথা শোনে না। হজরত ওমর (রা.) ছেলেটিকে ডেকে সাবধান করলেন এবং মা-বাবার হক আদায় না করায় তাকে শাসন করলেন। ছেলেটি বিনয়ের সঙ্গে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন! বাবার ওপর ছেলের কোনো হক নেই? তিনি বললেন, কেন থাকবে না? সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন! ওই হক তাহলে কী? তিনি বললেন, বিয়ে করার সময় সন্তানদের জন্য ভালো মা নির্বাচন করা, বাচ্চার সুন্দর নাম রাখা এবং তাকে পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেওয়া। (ইসলাম এবং তরবিয়তে আওলাদ, পৃ. ১৪২)

অতএব, সন্তানকে মানুষ করতে হলে একজন বাবার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকতে হবে বিচক্ষণতা ও দায়বদ্ধতার ছাপ। নেক সন্তানই হতে পারে পরকালের সম্বল। এই বিশ্বাস নিয়ে সন্তানকে ঘিরে বুনতে হবে স্বপ্নের জাল। সন্তানের জন্য হালাল উপার্জনে মনোযোগী হতে হবে। নিজেকে বেকার বা অকর্মণ্য না ভেবে ছোট-বড় যেকোনো হালাল রোজগারে লেগে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাবার অলসতা বা মানবিক দুর্বলতা সন্তানের জীবন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মায়ের দায়িত্ব

সন্তান পৃথিবীতে এসে সর্বপ্রথম যাঁর সান্নিধ্য লাভ করে, তিনি হচ্ছেন মা। সবচেয়ে বেশি যাঁর অনুসরণ বা অনুকরণ করে, তিনি হচ্ছেন মা। মায়ের প্রতিটি কথা ও কাজ, আচার-আচরণ শিশুর অবচেতন মনে রেখাপাত করে। তাই মায়ের কোল শিশুর প্রথম পাঠশালা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। তাই সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে বাবার চেয়ে মায়ের দায়িত্ব বেশি। এর জন্য সময় দিতে হবে প্রচুর। বাইরে কর্মব্যস্ত সময় না কাটিয়ে সন্তানের দেখভালে সময়, সক্ষম ও মেধা কাজে লাগাতে হবে। সন্তানকে মানুষ করতে হলে এর বিকল্প কিছু নেই। এটাকেই বলে পরিবার। মা-বাবা উভয়ে ঘরের বাইরে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়লে আয়া-বুয়া আর কেয়ারটেকার দিয়ে সন্তান মানুষ করা সম্ভব হবে না। বাবার দরদমাখা শাসন আর মায়ের মমতা না পেলে সন্তান হাতছাড়া হয়ে যাবে।

ঈমানি দীক্ষা

সদ্যোভূমিষ্ঠ শিশুর ডান কানে আজান আর বাঁ কানে ইকামত দেওয়ার মাধ্যমে সূচিত হয় ঈমানি দীক্ষা। তাই শিশু যখন বড় হতে থাকবে, তাকে ধীরে ধীরে ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে বোঝাতে হবে। যখন সে আরেকটু বড় হবে, তখন নামাজ-রোজার মতো ইসলামের বুনিয়াদি আমলগুলোতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আরো বড় হলে ইসলামী শরিয়তের মৌলিক বিধি-বিধান শিক্ষা দিতে হবে।

নবীজি (সা.) বলেন, তোমাদের শিশুদের সর্বপ্রথম কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শেখাও। আর যখন মৃত্যুর মুখে উপনীত হয়, তখনো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তালকিন করো। কেননা যার প্রথম কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আর শেষ কথাও হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, সে যদি হাজার বছরও বেঁচে থাকে, একটি  গুনাহ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসিত হবে না। (শু’আবুল ঈমান ৬/৩৯৮, হাদিস : ৮৬৪৯)

সাত বছরে উপনীত হলে সন্তানকে নামাজ-রোজার কথা বলতে হবে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘সাত বছর পূর্ণ হলে তোমাদের সন্তানদের নামাজের আদেশ দাও। ১০ বছর বয়সে নামাজের জন্য প্রহার করো এবং তাদের জন্য পৃথক পৃথক বিছানার ব্যবস্থা করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

অতএব, সাত বছর বা এর আগেই নামাজের প্রয়োজনীয় দোয়া ও সুরা-কেরাত সন্তানকে শিক্ষা দিতে হবে, সাধ্য থাকলে সন্তানকে নিয়ে হজ-ওমরাহ করা উচিত। এতে সে ছোটকাল থেকেই ইসলামের হুকুম জানতে পারবে ও শিখতে পারবে।

সন্তানের শিক্ষা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বয়স হলে সন্তানকে শিক্ষকের হক সম্পর্কে ধারণা দেওয়া অতি জরুরি। যেমন : ১. শিক্ষকের আদব রক্ষা করা। ২. শিক্ষকের প্রতি ভক্তি রাখা। ৩. শিক্ষককে আজমত ও শ্রদ্ধা করা। ৪. শিক্ষকের যথাসাধ্য খেদমত করা। ৫. শিক্ষকের সামনে বিনয়ের সঙ্গে কথা বলা ইত্যাদি।

মনে রাখতে হবে, শৈশবের খেলাধুলা, আদর-সোহাগ বিসর্জন দিয়ে শিশুকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিয়োজিত করা তার দৈহিক ও মানসিক গঠনের পক্ষে ক্ষতিকর। অবুঝ শিশুকে মাতৃকোল থেকে দূরে সরিয়ে পাঠচর্চায় ঠেলে দেওয়া শিক্ষার প্রতি বিরক্তির অন্যতম কারণ। দুরন্তপনা, দুষ্টুমি, চাঞ্চল্য আর বায়না ধরার বয়সে পড়ালেখার চাপ তার পক্ষে অস্বস্তিকর। বড়দের মতো রুটিনের শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে চলতে সে নিরানন্দ বোধ করে। ফলে তার মন চায় সদা এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পালাতে, যেকোনো ঠুনকো বাহানায় প্রতিষ্ঠানে না যেতে। ক্লাসে তার মন বসে না। অপেক্ষায় থাকে ছুটির ঘণ্টা কখন বাজবে, আর তখনই ছুটে যাবে খেলার সাথিদের কাছে। উপভোগ করবে শৈশবের সব আনন্দ।

ইদানীং শিশুদের নিয়ে এক শ্রেণির মা নিজেদের হার-জিতের খেলায় মেতে আছেন। এর জন্য শিশুকে বাড়তি চাপ দিয়ে পড়াশোনা করাচ্ছেন। ভর্তি পরীক্ষার নাম হয়ে গেছে ভর্তিযুদ্ধ। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা যেন মিনি বিসিএস। শিশুর ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগের ফলে তার ব্রেনে প্রভাব পড়ে, ফলে সে হয়ে ওঠে বিকারগ্রস্ত। শিশুর জীবনকে এমন ঝুঁকিতে ফেলা একজন সচেতন অভিভাবকের জন্য কখনো সমীচীন নয়।

আত্মবিশ্বাস তৈরি

অনেক অভিভাবক শুধু নিজের অভিলাষ আর স্বপ্ন পূরণে শিশুকে অসময়ে অনেক বেশি শিখিয়ে ফেলতে চান। বাড়তি এ ভার আরোপের ফলে শিশুকে হতাশায় পেয়ে বসে। ফলে তার মধ্যে জন্ম নেয় না পারার বোধ। সে ভাবে, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। কথায় কথায় বলে, আমি পারি না, পারব না। অথচ অগ্রগামিতার জন্য আত্মবিশ্বাস অতি জরুরি। আর না পারার বোধ শিশুকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।

প্রত্যেক শিশুর মধ্যে নিজস্ব প্রতিভা সুপ্ত থাকে। কারো বিকাশ জলদি ঘটে, কারো ঘটে ধীরে। তাই তুলনামূলক বেশি মেধাবীর সঙ্গে শিশুদের কখনো তুলনা করতে নেই। অমুকে পারে, তুমি কেন পারো না বলে তিরস্কার না করে বরং উৎসাহ প্রদান করা চাই। মাশাআল্লাহ সুন্দর হয়েছে, তুমি দেখি সব পারো, তোমাকে আরো ভালো করতে হবে। এ ধরনের কথা বলে শিশুর মনে আত্মবিশ্বাস জন্মানো উচিত।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঠিক বয়স

জেনে রাখা দরকার, শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঠিক বয়স কত? এ ব্যাপারে একটি হাদিসের আলোকে বলা যায়, সাত বছর বয়স থেকে তা হতে পারে। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের হুকুম দাও। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

এতে বোঝা যায়, নামাজ যদিও বালেগ হওয়ার পর ফরজ হবে; কিন্তু নামাজের শিক্ষাদান করতে হবে সাত বছর বয়স থেকেই। কাজেই সাত বছর বয়সই যথারীতি শিক্ষাদানের উপযুক্ত সয়ম। এরপর বিলম্ব করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর আগে চাপাচাপি করাও উচিত নয়। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তা সহজ করে দিয়েছেন। শিশুর বয়স যত কমই হোক না কেন, কোরআনের শিক্ষা তার ব্রেনে কোনোরূপ চাপ সৃষ্টি করে না। মুখে বোল ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই যদি শিশুকে আল্লাহ আল্লাহ বা কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ শেখানো হয়, তবুও সে তা সহজেই রপ্ত করতে পারে। এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি সব মা-বাবারই রয়েছে। অতএব, যে বয়সে শিশু পার্থিব পাঠ গ্রহণে অপরিপক্ব বা অনুপযুক্ত থাকে, সে সময় তাকে কোরআন শিক্ষা দিয়ে দেওয়াই হবে সময়ের যথার্থ মূল্যায়ন।

সুস্থ মা, সুস্থ শিশু

বাচ্চাদের স্কুল কোচিংয়ে হাজিরা দিতে গিয়ে নিত্য পেরেশানিতে মায়েরা। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে এবং তাদের ভালো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে বর্তমান সময়ে অভিভাবকদের বলা যায় এক ধরনের যুদ্ধে নেমেছেন। বিশেষ করে এ ব্যাপারে গৃহিণী ও কর্মজীবী মায়েদের আন্তরিকতার শেষ নেই। ঘরের কাজের বাইরে একজন মা স্কুল, কোচিংসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণমুখী শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দিনের প্রায় পুরো সময়টাই তাঁর সন্তানের পেছনে ব্যয় করছেন। সংসার সামলানোর পাশাপাশি সন্তানের পড়ালেখার তদারকি করার দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। সব মিলিয়ে একজন মায়ের কর্মব্যস্ত দিন শুরু হয় সেই ভোর থেকে, যা চলে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত। আর সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে এই মায়েরা তাঁদের শরীর-স্বাস্থ্যের প্রতি অবিচার করছেন। নিজের যত্নের প্রতি তাঁরা অমনোযোগী হয়ে পড়ছেন। অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান না করা ও যথাযথ বিশ্রাম গ্রহণ না করায় তাঁরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এর ফলে এই মায়েরা উচ্চ ও নিম্ন রক্তচাপ, আলসার, ডায়াবেটিস, রক্ত ও পানিশূন্যতা, পেটের পীড়া, গ্যাস্ট্রিক, মাথা ঘোরা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

এই যদি হয় মায়ের অবস্থা, তাহলে শিশু সুস্থ থাকবে কী করে? মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ রাখা তাই অতি জরুরি, কেননা সুস্থ মা-ই উপহার দিতে পারেন সুস্থ শিশু। সন্তানের পড়ালেখায় অতিউৎসাহ দেখাতে গিয়ে নিজেকে ভুলে গেলে চলবে না।

সার কথা

সন্তানের শিক্ষাদানে অতিউৎসাহ বা তাড়াহুড়োর অবকাশ নেই। ধীরস্থিরভাবে এগোতে হবে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘ধীরস্থিরতা আল্লাহর রহমতস্বরূপ, আর তাড়াহুড়ো শয়তানের কাজ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১২)

ধীরস্থির মানে সময়ক্ষেপণ নয়, বরং সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া। সঙ্গে সঙ্গে শিশুর সক্ষমতার মাত্রার প্রতি দৃষ্টি রাখা। উপযুক্ত সময়ে সে যতটুকু পড়াশোনা করার কথা, তা হচ্ছে কি না এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা।

সর্বোপরি শিশুকে আদর্শ মানব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ঘরে দ্বিনি পরিবেশ বজায় রাখা আবশ্যক। মহান আল্লাহর বিধান ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আদর্শে গৃহকে সজ্জিত করা হলে সেই আদর্শের আলোকে শিশুরা আলোকিত মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে। ইনশাআল্লাহ্।

 

লেখক : শিক্ষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।