আজকের বার্তা | logo

৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং

খুনি চিনতে ৩১ বছর!

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১১, ২০১৮, ০৯:২৯

খুনি চিনতে ৩১ বছর!

কুষ্টিয়ার বংশী তলায় খুন হন নূর মোহাম্মদ। দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে হত্যা করে ফেলে যায়। তিনি ছিলেন সাধারণ একজন দিনমজুর। এলাকার ধনী পরিবারের বাসা-বাড়িতে কাজ করতেন। স্থানীয় প্রভাবশালী মাজেদ আলী জোয়ার্দারের বাড়ির কথা বলে এক রাতে বাসা থেকে বের হন। পরদিন তার গুলিবিদ্ধ লাশ মিলে। বাসা থেকে বেরোনোর সময় তার সাত বছরের ছেলে আমিরুল কুপি বাতি দিয়ে এগিয়ে দেয়। নূর মোহাম্মদের লাশ উদ্ধারের পর তার মালিক মাজেদ আলী কুষ্টিয়া সদর থানায় নিজেই বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় স্থানীয় আলতাফ মোল্লাসহ ১৩ জনকে আসামি করেন তিনি। তাদের গ্রেফতারে বার বার তাগাদা দেন মাজেদ। কুষ্টিয়া পুলিশ খুনের মামলা তদন্ত শুরু করে। আসামিরা গা ঢাকা দেয়। পুলিশ দুই আসামিকে গ্রেফতার করে। কিন্তু খুনের বিষয়ে কোনো তথ্য পায় না। বাকি আসামিদেরও ধরতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। ঘটনাটি ১৯৮৭ সালের জুনের শেষ সপ্তাহের। খুনের শিকার নূর মোহাম্মদ দিনমজুর হওয়ায় থানা পুলিশের তদন্ত গাছাড়া। এভাবেই দিন যায়, মাস যায়। বছর কাটে। কেন খুন হলেন নূর মোহাম্মদ, তা অজানাই থেকে যায়। তবে এজাহারভুক্ত আসামিদের দেখা যায় না এলাকায়। মামলাটি ধামাচাপা পড়ে। কুষ্টিয়া থানা পুলিশ প্রথমে মামলাটি তদন্ত করে। সদর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নিখিল কুমার ও পরিদর্শক আবদুস সোবহান ছিলেন মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা। কুষ্টিয়া জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-কে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন।

ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া জেলা সিআইডির পরিদর্শক আবদুল বারেক মামলাটি তদন্ত শুরু করেন। মামলার তদন্তে আলতাফ মোল্লাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে খুন করল কে? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে তদন্ত জোরালো করে পুলিশ। লাভ হয় না।

এ অবস্থায় নূর মোহাম্মদের দ্বিতীয় স্ত্রী তহুরুন্নেসা মামলাটির সঠিক তদন্ত হচ্ছে না উল্লেখ করে আদালতে একটি ফৌজদারি মিস মামলা করেন। ১৯৮৮ সালের ২৬ এপ্রিল আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে তহুরুন্নেসার দায়ের করা মামলাটি খারিজ করে দেয়। সিআইডি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল বারেক পুনরায় মামলা তদন্ত শুরু করেন। তবে মামলার কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে নূর মোহাম্মদের দ্বিতীয় স্ত্রী হাই কোর্টে ফের মিস মামলা (মামলা নম্বর ৩১/১৯৮৮) করেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ৪ নভেম্বর শুনানি শেষে বাদীর মিস মামলাটি খারিজ করে দেয় হাই কোর্ট। তবে এই একযুগে মামলাটির তদন্ত স্থগিত থাকে। মিস মামলা খারিজ হওয়ার পর সিআইডি পুনরায় তদন্ত শুরু করে। সিআইডির ১১ জন কর্মকর্তা এ মামলা তদন্ত করেন। সিআইডির তদন্তে স্পষ্ট হতে থাকে যে, আলতাফ মোল্লারা এই ঘটনায় জড়িত নয়। অন্য কোনো গ্রুপ জড়িত রয়েছে। সিআইডি সেই গ্রুপের সন্ধানে কাজ করে। সিআইডির সন্দেহ মামলার বাদী মাজেদ আলী নিজেই খুনি। কিন্তু কীভাবে তাকে ধরবে? প্রভাবশালী ব্যক্তি তিনি। মামলার গতিপ্রকৃতি ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে। আরেকটি মামলা করার কথা ভাবে সিআইডি। সিআইডি নূর মোহাম্মদের স্ত্রীকে আরেকটা মামলা করার অনুরোধ করে। তাই নূর মোহাম্মদের প্রথম স্ত্রীর ছেলে মো. আমিরুল ইসলামকে দিয়ে ২০০৫ সালের ৩০ জানুয়ারিতে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একটি হত্যা মামলা (মামলা নম্বর ০২/২০০৫) দায়ের করায়। আমিরুলের দায়ের করা মামলায় মাজেদ আলী জোয়ার্দার (৯৪), মোহাম্মদ কুদ্দুস জোয়ার্দার (৯০), গোলাম কিবরিয়া (৬৫) ও মোহাম্মদ কালাম (৬০)সহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে সিআইডি ২০০৫ সালের ৩০ এপ্রিল মূল মামলাটি তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। অপরদিকে, নূর মোহাম্মদের ছেলের আদালতে দায়ের করা মামলাটিকে কুষ্টিয়া থানায় নিয়মিত মামলা (নম্বর ৪৫) হিসেবে দায়ের করানো হয়। সিআইডির এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধেও মাজেদ আলী আদালতে নারাজি দেন। ফলে ২০১২ সালের ১৪ জুন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত ১-এ শুনানি মঞ্জুর করে মামলার নথি নিম্ন আদালতে পাঠায়। ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মামলাটি সেখানেই আদেশের অপেক্ষায় থাকে। ওই দিনই (৭ সেপ্টেম্বর) আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে পাঠায়।

পিবিআই ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করে। তদন্ত শেষে নূর মোহাম্মদ হত্যা মামলায় অভিযোগ দাখিল করেন পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা। নূর মোহাম্মদের ছেলে আমিরুল ইসলামসহ আরও দুই ব্যক্তি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন— মোহাম্মদ আলী ও ইয়াকুব আলী। তাদের জবানবন্দিতেও এই হত্যার সঙ্গে মাজেদ আলীর জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ঘটনার সময় আমিরুলের বয়স ছিল সাত বছর। ঘটনার রাতে তার সামনে থেকেই নূর মোহাম্মদকে ডেকে নেন মাজেদ আলী। এ সময় কুপি (বাতি) দিয়ে আমিরুল তার বাবাকে এগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মাজেদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তখন ছিল না।

অভিযুক্তরা সবাই বৃদ্ধ, দুজন বেঁচে নেই

পিবিআই দায়িত্ব পাওয়ার পর নূর মোহাম্মদ হত্যায় দায়ের করা দুটি মামলার তদন্ত করে। গত বছরের ২ অক্টোবর পিবিআই মাজেদ আলী জোয়ার্দারের দায়ের করা মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। অপরদিকে, নূর মোহাম্মদের ছেলের দায়ের করা মামলাটির তদন্ত শেষে মাজেদ আলী জোয়ার্দারসহ ১০ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। ১০ আসামির মধ্যে ?দুই আসামি মারা গেছেন। আর জীবিত সবাই বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। আদালত ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। মাজেদ আলী যখন খুন করে, তখন তার বয়স ছিল ৬২ বছর। এখন তিনি আসামি। বয়স তার ৯৪।

পিবিআই সূত্র জানায়, আশির দশকে কুষ্টিয়ার বংশী পাড়া এলাকায় দুটি গ্রুপ ছিল। একটি মাজেদ আলী জোয়ার্দার গ্রুপ, অপরটি আলতাফ মোল্লা গ্রুপ। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই সময় দুটি গ্রুপের মধ্যে রক্তাক্ত সংঘর্ষ হতো। ১৯৮৬ সালের মার্চে আলতাফ মোল্লা গ্রুপের একজন খুন হন। ওই মামলায় মাজেদ জোয়ার্দারকে আসামি করে আলতাফ মোল্লা মামলা করেন। তখন সেই মামলা থেকে রেহাই পেতে এবং প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে নিজের কাজের লোক (নূর মোহাম্মদ)-কে খুন করে মাজেদ জোয়ার্দার। বর্তমানে এলাকায় এই দুই গ্রুপের কোনো প্রভাব নেই। তারা সবাই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। পিবিআই তাদের তদন্তে জানতে পারে, ঘটনার পর থেকে মাজেদ আলী মামলার দেখাশোনার ভার নেয়। পুলিশের সন্দেহের তীর যখন মাজেদের দিকে যায়, তখনই নূর মোহাম্মদের দ্বিতীয় স্ত্রীকে দিয়ে আদালতে পুলিশের বিরুদ্ধে নারাজি দেওয়ায়। এমন করতে করতে সে ৩১ বছর পার করে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, পরিস্থিতি পাল্টেছে। নূর মোহাম্মদের ছেলের বয়স এখন ৩৮। সে তখন ৭ বছরের শিশু ছিল, তার সামনে তার বাবাকে নিয়ে গেছে। ভয়ে কিছু বলতে পারেনি। এখন প্রভাবশালী মাজেদের গায়ে নেই শক্তি। আগের প্রভাব নেই। সে এখন আসামি। খুনি কখনো পার পায় না। ৩১ বছর পরে হলেও তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। সূত্র:- বাংলাদেশ প্রতিদিন।

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।