আজকের বার্তা | logo

৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং

আমার শহর বরিশাল এখনো বেঁচে আছে!

প্রকাশিত : জানুয়ারি ০৪, ২০১৮, ১৮:৪৪

আমার শহর বরিশাল এখনো বেঁচে আছে!

অনলাইন ডেক্সঃ লঞ্চ থেকে নেমে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে কয়েক কিলোমিটার দূরের গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগল মাত্র ১৫ মিনিট। খুব সকাল বলে নয়, বরিশালের সড়কগুলোতে দিনের কোনো ভাগেই তেমন একটা যানজট তৈরি হয় না। ভোর, দুপুর, সন্ধ্যা—কোনো বেলাতেই ঢাকার মতো রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় না। নগরবাসীকে যানবাহনে উঠতে ধাক্কাধাক্কি করতে হয় না। কালো ধোঁয়া কিংবা অত্যধিক ধুলাবালি থেকে বাঁচতে নাক ঢাকতে হয় না।

দেশের ৮টি বিভাগীয় শহরের মধ্যে বরিশাল একটি। অবশ্য মহানগর বলতে যা বোঝায়, বরিশাল এখনো তা হয়ে ওঠেনি। বিভাগীয় শহর হিসেবে এটি দেশের কোনো কোনো জেলা শহরের চেয়েও ছোট। যদিও বরিশাল দেশের পুরোনো নগরের মধ্যে একটি। ১৮৬৯ সালে বরিশাল পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালে বরিশাল বিভাগ গঠিত হয়। ২০০২ সালে হয় বরিশাল সিটি করপোরেশন।

সব মিলিয়ে ৫৮ বর্গকিলোমিটারের বরিশাল শহরে বহুতল ভবন এখনো হাতে গোনা। দু-একটি এলাকা বাদে শহরের বাকি অংশে একতলা বা দোতলা বাড়ির সংখ্যা বেশি। অনেক বাড়ির সামনে আঙিনা আছে, তাতে আছে অনেক রকমের গাছ। পার্কগুলোতে সাধারণ মানুষ প্রাতর্ভ্রমণ অথবা বৈকালিক ভ্রমণে যেতে পারে। শহরের দু-একটি পুকুরে এখনো লাল শাপলা ও পদ্মফুল ফোটে। সিটি করপোরেশনের পুকুরগুলো এখনো আস্তাকুঁড়ে পরিণত হয়নি। নগরের উত্তর ও পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তনখোলা নদীতে নির্বিঘ্নে মাছ বড় হয়। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ জনসংখ্যার শহর বরিশাল এখনো বেঁচে আছে। মানুষের বসবাসের উপযোগী আছে। কিন্তু শহরটি কত দিন বাসোপযোগী থাকবে, তা নিয়ে এখন সংশয়ে আছেন নগরবাসী।

বরিশালে চার দিন ছিলাম। অস্থায়ী বাসস্থান ছিল নগরের পশ্চিম পাশে, সিঅ্যান্ডবি রোড এলাকায়। প্রতিদিন সকালে উঠে আমাকে উল্টো দিকে, শহরের আরেক পাশে বিবির পুকুরের কাছে যেতে হতো। রাস্তায় নামলেই আমি রিকশা অথবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পেয়ে যেতাম। রিকশাচালক অলিগলি ঘুরে গন্তব্যে নিয়ে যেতেন। কোথাও যানজটে আটকে থাকতে হয়নি। অথবা ঢাকার মতো ‘ইউটার্ন’ নিতে এক-দুই কিলোমিটার ঘুরতে হয়নি।

সিটি করপোরেশনের হিসাবে, বরিশালে মোট রাস্তার দৈর্ঘ্য ৬৪৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে নবগ্রাম সড়কের পুরোটা ও হাসপাতাল সড়কে আংশিক বিভাজক বা ডিভাইডার আছে। বাকি রাস্তাগুলো সরু। এসব রাস্তায় প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ রিকশা ও অটোরিকশা চলে। বরিশালে অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলে না। ২০০৯ সালে সাবেক মেয়র শওকত হোসেন সিটি বাস চালু করেছিলেন। সরু রাস্তায় বাস চলতে গিয়ে যানজট হয়। তাই কয়েক বছর আগে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বরিশালের মূল বাহন তাই অটোরিকশা। কোনোটি ব্যাটারিতে চলে, কোনোটি আবার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার লাগিয়ে চলে। অটোরিকশাগুলো বাসের মতো বিভিন্ন রুটে ট্রিপ দেয়। আবার আপনি চাইলে এককভাবে ভাড়াও নিতে পারেন। শহরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় যেতে ভাড়া মোটামুটি ১০০ টাকা।

এ রকমই একটি অটোরিকশার চালক মুহিব উল ইসলাম জানান, শহরের হলুদ রঙের অটোরিকশা একটি অংশে চলে। আবার নীল রঙের অটোরিকশা চলে আরেক অংশে। যানজট এড়াতে মেট্রোপলিটন পুলিশ এ ব্যবস্থা করেছে। অবশ্য ‘মাহিন্দ্র’ নামের ডিজেলচালিত অটোরিকশায় যাত্রীরা যেকোনো জায়গায় যেতে পারে।

একনজরে বরিশাল
* নগরের আয়তন প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার
* জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ
* ১৮৬৯ সালে পৌরসভা হয়, ২০০২ সালে হয় সিটি করপোরেশন
* বাড়ির সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার ৩০০টি

বরিশালে মোট হোল্ডিং বা বাড়ির সংখ্যা ৪২ হাজার ৩০০। এসব বাড়িতে পানি সরবরাহ করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু নগরবাসীর অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী পানি মেলে না। অবশ্য পানি সরবরাহ বাড়াতে পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ–সংযোগের অভাবে সেটি চালু হয়নি। নগরের দৈনন্দিন আবর্জনা ও বাসাবাড়ির ময়লা পরিষ্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। অভিযোগ আছে, এ দায়িত্বও ঠিকভাবে পালিত হয় না। অনেক নগরীর যেসব জমি বা প্লটে এখনো বাড়ি নির্মিত হয়নি, আশপাশের মানুষ সেখানেই ময়লা ফেলে।

বরিশাল জেলায় পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস–সংযোগ দেওয়া হয়নি। কয়েক বছর আগেও প্রতিটি বাড়ির ছাদে অথবা আঙিনায় মাটির চুলা ছিল। কাঠ পুড়িয়ে সেখানে রান্না হতো। এখন কাঠের বদলে রান্না হয় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পুড়িয়ে। ঢাকার মানুষ যেখানে ৮০০ টাকা বিল দিয়ে দুই চুলায় রান্না করতে পারেন, সেখানে বরিশালে মাঝারি পরিবারে ব্যয় হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।

বরিশালের শিক্ষা ও চিকিৎসা অন্যান্য বিভাগীয় শহরের মতোই। মানুষ সেবা নেয় মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে। শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০১। এর মধ্যে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল আছে দুটি। বেসরকারি কিছু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।

বড় হওয়ার একটা পর্যায়ে ঢাকাও এখনকার বরিশালের মতো ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল, দূষণের কারণে আর অবকাঠামোহীনতায় ঢাকা মহানগর এখন আর বাসোপযোগী নেই। দিন দিন ঢাকার মতো অবস্থা হচ্ছে চট্টগ্রামেরও। বরিশালও যেন সেই পথে হাঁটছে। শহরটিকে একসময় প্রাচ্যের ভেনিস বলা হতো। ইতালির ভেনিস শহর যেমন খালের জন্য বিখ্যাত, বরিশালেও তেমনি ২২টি খাল ছিল। তবে স্থানীয় মানুষের মুখে ভেনিস শব্দটি শুনিনি। বরিশালের খালগুলোর সঙ্গে এ উপমাটাও হারিয়ে যাচ্ছে। শহরের ভেতরে এখনো প্রবহমান আছে জেলখাল, আমানতগঞ্জ খাল, সাগরদী খাল ও লাকুটিয়া খাল। বাকি খালগুলো দখল হতে হতে সরু হয়ে গেছে। সেখানে পানির প্রবাহ ক্ষীণ।

জেল খালের পাশে এক চায়ের দোকানে খালগুলোর করুণ দশার কথা জানান বরিশালে চার দশক ধরে বসবাস করা আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, একসময় এসব খালে বড় বড় নৌকা চলত। মানুষ গোসল করত, মাছ ধরত। এখন সবাই ময়লা ফেলে।

বরিশাল শহরের সমস্যা কী কী? এ প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে কয়েকটি উত্তর পেলাম। এর মধ্যে বড় সমস্যাগুলো হলো শহর পরিকল্পনা ছাড়া বড় হচ্ছে। শহরের উত্তর ও পশ্চিমে মানুষ নতুন ঘরবাড়ি করছে, কিন্তু রাস্তার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকছে না। এখনই বর্ষায় বরিশালে জলাবদ্ধতা হয়। অলিগলি এত সরু যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যেতে পারে না। পয়োবর্জ্য খাল ও নালায় ফেলা শুরু হয়েছে। খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে।

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক এম মোয়াজ্জেম হোসেন বরিশালে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পরিবর্তনগুলো দেখেছেন। এখনকার বরিশালকে ঢাকার সঙ্গে তুলনা করতে বললে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা থেকে যখন বরিশালে ফিরি, তখন প্রাণখুলে শ্বাস নিতে পারি। ঢাকা যেভাবে বসবাস–অযোগ্য হয়েছে, বরিশালকে সেটা হতে দেওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, আগের মেয়র শওকত হোসেন অনেক উন্নয়নকাজ করেছেন। কিন্তু পরিকল্পনামাফিক হয়নি। বরিশালকে পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় করতে হবে।

বরিশালের জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে এবং ২০১১ সালে তার প্রজ্ঞাপন হয়েছে। বরিশাল নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ নগর–পরিকল্পনাবিদ আসাদুজ্জামান বলেন, এ শহরকে এখনো বাঁচানো সম্ভব। তবে সে জন্য পরিকল্পনা মেনে চলতে হবে। সিটি করপোরেশন ভবনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে তা মানছে না।

এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের অজুহাত জনবল না থাকা। বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র আহসান হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, মহাপরিকল্পনা হলেও জনবলসংকটসহ নানা কারণে সে অনুযায়ী কাজ করা যায়নি। অবশ্য তিনি পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার জন্য এখন থেকে সমন্বিত উদ্যোগে কাজ শুরুর আশ্বাস দেন।

বরিশালে গেলে আপনি মোড়ে মোড়ে মিষ্টির দোকান পাবেন। সব দোকানে দাম মোটামুটি একই। ছোট রসগোল্লা ১০ টাকা, বড়টা ২৫ টাকা। মিষ্টি খেয়ে রাতের বেলা বাসায় ফিরতে আপনাকে ভীত হতে হবে না। বরিশালে ছিনতাইয়ের ঘটনা খুব বেশি ঘটে না। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আগের মতো নেই। তবে মাদক সমস্যা রয়ে গেছে। অন্যান্য জেলার মতো বরিশালের তরুণদের একটি অংশ ইয়াবায় আসক্ত। শহরে এ মাদক সহজলভ্য বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। অন্যান্য মাদক পাওয়াও কঠিন নয়।

শহরে ঘুরলে আপনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও তাঁর বড় ছেলে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর প্রচুর ছবি দেখতে পাবেন। ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা জেলা ও নগরের ওই দুই নেতাকেই খুশি করতে ব্যস্ত, তা সহজেই বোঝা যাবে। যাকেই জিজ্ঞাসা করবেন, জবাব একটাই—বরিশালের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও তাঁর বড় ছেলে। অবশ্য শহরটিতে রাজনৈতিক সহাবস্থান আছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আছে। কবি জীবনানন্দ দাশের ওই শহরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও উন্নত পর্যায়ের।

ঢাকা থেকে গিয়ে এক সপ্তাহ বরিশাল থাকলে আপনার এই আক্ষেপ হতে পারে, আপনাকে কেন ঢাকায় থাকতে হয়। সহকর্মী সাংবাদিককে বললাম এ কথা। উত্তরে তিনি বললেন, যে অবস্থা চলছে, পাঁচ বছর পরে এমন আক্ষেপ না–ও হতে পারে।

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।