আজকের বার্তা | logo

১০ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং

শূন্য হাতেও সোনা ফলে

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭, ০২:০৩

শূন্য হাতেও সোনা ফলে

মেহেরুন্নেসা বেগম ॥ আলী আহম্মদ মিয়া বরিশাল সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের তিলক গ্রামের এক সফল মৎস্য চাষি। ১৯৭৪ সালে এসএসসি পাস করে বাবার পেশা কৃষিকাজে তিনি নিয়োজিত হন। বাবা আসমত আলী মাঝি হিজলা উপজেলার গুয়াবাড়িয়া গ্রাম থেকে তার জন্মের পাঁচ বছর পূর্বে নদী সিকস্তি হওয়ায় শূন্য হাতে এ গ্রামে এসে আশ্রয় নেন। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। বাবার মৃত্যুর সময় আলী আহম্মদের বয়স মাত্র ১০ বছর। বর্তমানে তার বয়স ৬৩ বছর, পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ।

১৯৭৬ সালে এইচএসসি পাসের পর তিনি সৈনিকের চাকরি পান কিন্তু অন্য ভাইদের পরামর্শ অনুযায়ী চাকরিতে যোগদান না করে মৎস্য চাষে নিয়োজিত হন। তিনি ১৯৮০ সালে কৃষি ব্যাংক’র রায়পাশা শাখা থেকে বিশ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে অন্যের পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন। এতে তার সফলতা আসে। পরবর্তী বছর তিনি মাছ চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। মাছ চাষে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় তিনি স্থানীয় জমি ক্রয় করে দিঘি এবং পুকুর খনন করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করেন। বর্তমানে তার জমির পরিমাণ ১১ একর যার বাজার মূল্য আনুমানিক ১০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যেই তিনি বসবাসের জন্য ৬ কক্ষবিশিষ্ট একতলা একটি ভবন নির্মাণ করেছেন।

স্থানীয় সমাজকর্মী কাজী আজাদ (৫৬) বলেন, ‘‘পরিশ্রম সফলতার চাবিকাঠি, আলী আহম্মদ তারই উদাহরণ। আমরা তার জন্য গর্বিত।” মৎস্য চাষ করে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অন্যের নজর কেড়েছে। তিনি দীঘি এবং পুকুরের পাড়ে গাছ লাগিয়েছেন ১১ হাজারের মত। প্রতি বছরই তিনি গাছ লাগান। একটি গাছ কাটলে তিনি দুটি গাছের চারা রোপণ করেন। আর তাই বছর গেলেই খতিয়ানে বাড়ে গাছের সংখ্যা। তিনি নিজেই গাছ এবং মাছের পরিচর্যা করেন তাই মাছ এবং গাছের সাথে গড়ে উঠেছে তার আত্মিক সম্পর্ক। এ কাজে সহযাগিতা করার জন্য তিনি সার্বক্ষণিকভাবে ১২জন বেতনভুক্ত শ্রমিক নিয়োগ করেছেন। নিয়োগপ্রাপ্ত এ সব শ্রমিকরা সার্বক্ষণিক এ কাজে নিয়োজিত আছে। অন্যান্য মৎস্য চাষিদেরকে তিনি মাছ চাষের নিয়ম-পদ্ধতি, মাছের পরিচর্যা ইত্যাদি বিষয়ক পরামর্শ দিয়ে মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করেন। তার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই এখন মাছ চাষে এগিয়ে এসেছেন। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সেতুবন্ধন কাবের সাধারণ সম্পাদক ও এলাকার নানাবিধ সামাজিক কাজের সাথে জড়িত।

বরিশাল সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, ‘‘আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ মৎস্যখাতে নিয়োজিত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে।” জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্য আহরণে ২০১৬ সালে বিশ্বে বাংলাদেশ ৪র্থ স্থান অধিকার করেছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, মৎস্য সেক্টরে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক দশমাংশ নারী। বিগত আট বছরে এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গড়ে বার্ষিক অতিরিক্ত প্রায় ৬ লক্ষাধিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘‘মানুষের প্রোটিন প্রাপ্তির শ্রেষ্ঠ উৎস হচ্ছে মাছ।’’ এ উপজেলার মোট মৎস্য চাষির সংখ্যা ৫,২৫৫ জন এবং মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৪৭০৫ জন। এ উপজেলায় মৎস্য চাষির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৎস্য চাষি এবং মৎস্যজীবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এ উপজেলায় বছরে মাছের উৎপাদন ১০,৮১১ মেট্রিক টন এবং চাহিদা প্রায় ৬,০০০ মেট্রিক টন। চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদিত মৎস্য দেশের অন্যত্র রপ্তানি করা হয়। দেশে মৎস্য উৎপাদনে বিগত বছরের তুলনায় ৫.২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

আলী আহম্মদ নিজেই মাছের জন্য কম্পোস্ট সার তৈরি করেন বলে জানান। ঘাস, কচুরিপানা, সবুজ লতাপাতা, গোবর ইত্যাদির সমন্বয়ে তিনি এ সার তৈরি করেন। কখনও বা ঘেরের পাশে কখনও বা দিঘি বা পুকুরের মধ্যেই এ সার তৈরি করেন। সার তৈরির উপকরণ খাবার হিসেবে খেয়ে দ্রুত মাছের বৃদ্ধি হয়। এতে মাছ খেতে সুস্বাদু এবং দেখতেও সুন্দর হয়। বাজারে এ ধরনের মাছের চাহিদা বেশি। ফরিদপুর জেলার সিঅ্যান্ডবি ঘাট থেকে তিনি মাছের পোনা সংগ্রহ করেন। পোনা বিক্রেতারা তার দীর্ঘ দিনের পরিচিত হওয়ায় চাহিদামত তারা পোনা সরবরাহ করেন। স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের নিকট তিনি নগদ মূল্যে বড় মাছ বিক্রি করেন। আলী আহম্মদ রুই, কাতল, মৃগেল, মিনার কার্প, সিলভার কার্প, মনোসেক্স, তেলাপিয়া, পাঙাস এবং চিংড়ি মাছ চাষ করেন। কৃষি ব্যাংক রায়পুরা শাখা থেকে ঋণ হিসেবে সর্বশেষ নেয়া ৩০ লাখ টাকার কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছেন বলে জানান তিনি।

আলী আহম্মদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ছোট সংসার। স্ত্রী বেঁচে আছেন, দুই মেয়েই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং তাদের বিয়েও হয়েছে। একমাত্র ছেলে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বর্তমানে পিএইচডি করার চেষ্টা করছেন। আলী আহম্মদ তার ছেলেকে নিজের পেশায় নিয়োজিত করতে চান এবং ছেলেরও এতে আগ্রহ আছে। সরকারি চাকরি পেয়েও যোগদান না করে মৎস্য চাষ করে আজ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন আলী আহম্মদ। একইসাথে তিনি এ পেশায় অনেককেই যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। আলী আহম্মদের বিশ্বাস, সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে ভাগ্য গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করলে সফল হওয়া সম্ভব।

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।