আজকের বার্তা | logo

৩১শে শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৪ই আগস্ট, ২০১৮ ইং

যে কারণে রংপুরে আওয়ামী লীগের ভয়াবহ বিপর্যয়

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭, ১৬:০৭

যে কারণে রংপুরে আওয়ামী লীগের ভয়াবহ বিপর্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: হিসাব-নিকাশ চলছে কী কারণে ভয়াবহ ফল বিপর্যয় হয়েছে রংপুর সিটিতে আওয়ামী লীগের। সব প্রার্থীর চেয়ে মোট ভোটে চমক দেখিয়েছেন জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। বিএনপি আগে থেকেই রংপুরে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু টানা পাঁচ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। কুমিল্লার পর রংপুরের এ হার নিয়ে দলের একটি গ্রুপ নিজেদের অন্যভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের গোছানো নির্বাচনী পরিকল্পনার অভাব, জাতীয় পর্যায়ে টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে সার্বিক সরকারবিরোধী সেন্টিমেন্ট, রংপুরে ঝন্টুর পরিকল্পিত উন্নয়ন না করা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। কয়েক বছর ধরে সংগঠনের দিকে নজর দেওয়ার চেয়ে স্থানীয় নেতারা অভ্যন্তরীণ বিরোধে বেশি সময় কাটিয়েছেন। মেয়র পদে নিত্যনতুন ভোগবিলাসী প্রার্থীদের আনাগোনা, হেলিকপ্টার নিয়ে ওড়াউড়ি, নায়ক-নায়িকাদের নাচানাচি দলের ভিতরে সংকট তৈরি করেছিল। যার বিরূপ প্রভাব মেয়র নির্বাচনে পড়ে। রংপুর আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, ঝন্টুর বিরুদ্ধে দলের কারা কাজ করেছেন তাও বের করতে হবে। যারা পরিকল্পিতভাবেই আওয়ামী লীগকে ডুবিয়েছেন তাদের কথা দলের নীতিনির্ধারক মহল জানে।

এর বিপরীতে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা খুবই জনপ্রিয় প্রার্থী। গত মেয়র নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন পাননি। তার পরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। এ কারণে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবার তার ভাতিজাকে বাদ দিয়ে তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় একটি টিম দলের গ্রুপিং বন্ধে সক্ষম হলেও আওয়ামী লীগ তা পারেনি। বরং আওয়ামী লীগের গ্রুপিং সর্বনাশ ডেকে আনে।

কুমিল্লার পর রংপুরের বিপর্যয় আগামী সিটি নির্বাচনগুলোয় পড়বে না আওয়ামী লীগ নেতারা এমনটি মনে করলেও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, রংপুর আর কুমিল্লা থেকে শিক্ষা না নিলে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরকারি দলে পড়তে পারে। এদিকে আমাদের রংপুর প্রতিনিধি শাহজাদা মিয়া আজাদ জানান, পাঁচ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে রংপুর সিটি এলাকায় চোখে পড়ার মতো উন্নয়ন করেছিলেন সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু।

সিটি এলাকায় আওয়ামী লীগেরও ৫০-৬০ হাজার ভোট রয়েছে। ৬০ হাজার ভোট রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের। নিজেরও ৪০ হাজারের বেশি পকেট ভোট রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন ঝন্টু। এত ভোট, এত উন্নয়ন কোনোটাই নৌকার জয়ের পালে হাওয়া লাগাতে সহায়তা করেনি। বরং নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। ৯৮ হাজার ৯৮ ভোটের ব্যবধানে ঝন্টুকে পরাজিত করে নগর পিতা হলেন জাতীয় পার্টির মোস্তফা। সিটির প্রথম নির্বাচনে নাগরিক কমিটির প্রার্থী হয়ে ঝন্টু ২৮ হাজারের বেশি ভোটে মোস্তফাকে পরাজিত করে মেয়র হয়েছিলেন। তখন ঝন্টু পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬ হাজার ২৫৫ ভোট। আর মোস্তফা ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট। আর এবার ঝন্টু পেয়েছেন ৬২ হাজার ৪০০ এবং মোস্তফা ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯ ভোট।

কেন এমন হলো— নৌকাডুবির কারণ খুঁজতে গিয়ে দুটি কারণ উঠে এসেছে। বেশির ভাগ নগরবাসী মনে করেন, মানুষের সঙ্গে ঝন্টুর খারাপ আচরণই নৌকার জন্য কাল হয়েছে। আবার কেউ বলছেন ঝন্টুকে নৌকা প্রতীক দেওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ সক্রিয়ভাবে তার পক্ষে কাজ করেনি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের যে ১৩ নেতা মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন তারা ঝন্টুর পক্ষে গণসংযোগে অংশ নিলেও তা ছিল ‘লোক দেখানো’। ওই নেতারা ঝন্টুকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারছিলেন না। ঝন্টুকে হারানোর পেছনে তারাও অনুঘটকের কাজ করেছেন।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) রংপুর জেলা শাখার সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মলয় কিশোর ভট্টাচার্য বলেন, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক। তারা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে অর্থ-সম্পদ চায় না। তারা চায় জনপ্রতিনিধি হবেন জনবান্ধব। তাদের কাছ থেকে ভালো আচরণ, সম্মান আশা করে সবাই। ঝন্টু সাহেব তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ঝন্টুর পাশাপাশি নৌকার পরাজয় হয়েছে বলে আমি মনে করি।’ বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) রংপুর জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল ওয়াহেদ মিঞা বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাহেব দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। ২৬ বছর ধরে রংপুর সদর আসনের এমপি। তিনি কোনো উন্নয়ন করেননি। সিটিতে যত উন্নয়ন হয়েছে তা গত ১০ বছরে হয়েছে। পাঁচ বছরে ২০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সিটি করপোরেশনে সব সমস্যা সমাধান করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। মেয়র ঝন্টু অনেক উন্নয়ন করেছেন। এর পরও মানুষ নৌকার ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল কেন? আমি মনে করি, এর পেছনে দুটি কারণ— একটি হলো ঝন্টু সাহেবের খারাপ আচরণ। মানুষ তার কাছ থেকে ভালো আচরণ পায় না। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি মানুষকে মানুষ মনে করতেন না। যে কারণে এবারের ভোট তার জন্য কাল হয়েছে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো আওয়ামী লীগ ঝন্টু সাহেবকে মনোনয়ন দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ভোটের মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে তার পক্ষে কোমর বেঁধে কাজ করতে দেখা যায়নি। দলীয় প্রার্থীকে জয়ী করে আনার জন্য ভোটের যত রকম কৌশল রয়েছে তা প্রয়োগ করা হয়নি। স্থানীয় নেতারা দায়সারাভাবে কাজ করেছেন। ফলে ভোটাররা লাঙ্গলের ওপর আস্থা রেখেছেন।’

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোতাহার হোসেন মণ্ডল মওলা বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী ঝন্টু ভাইয়ের পক্ষে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেছি। আমি দেখেছি মানুষ নৌকাকে ভোট দিতে চায়, ঝন্টু সাহেবের আচরণে তারা তার প্রতি ভীষণ ক্ষুব্ধ। কিছুতেই ভোটারদের সমর্থন আদায় করা যাচ্ছিল না। এ ছাড়া আমাদেরও যে গাফিলতি ছিল না তা নয়, আমরা অনেকেই একনিষ্ঠ হয়ে কাজ করতে পারিনি।’ ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চব্বিশ হাজারী এলাকার ভোটার রায়হানুল কবীর, আশরাফুল আলমসহ বেশ কয়েকজন বলেন, ‘গত নির্বাচনে আমরা এলাকার মানুষ ঝন্টুর পক্ষে কাজ করেছিলাম। চব্বিশ হাজারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২ হাজার ৯০০ ভোটের মধ্যে ঝন্টু পেয়েছিলেন ১ হাজার ৭০০। এবার পেয়েছেন মাত্র ৩৪৪ ভোট। গতবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আমরা তার অফিসে এলাকার একটা উন্নয়নকাজের জন্য গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বের করে দিয়েছিলেন। ভোটে তার ফলও পেয়েছেন। এলাকার মানুষ লাঙ্গলে ভোট দিয়েছে।

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।