আজকের বার্তা | logo

৮ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২২শে জুন, ২০১৮ ইং

কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭, ১৬:০৪

কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল

ঘরহীন ওরা, ঘুম নেই চোখে/ যুদ্ধে ছিন্ন ঘরবাড়ি দেশ/ মাথার ভিতরে বোমারু বিমান/ এই কালরাত কবে হবে শেষ/ শত শত মুখ হায় একাত্তর/ যশোর রোড যে কত কথা বলে/ এত মরা মুখ আধমরা পায়ে/ পূর্ববাংলা কলকাতা চলে…

অ্যালেন গিন্সবার্গ যতটা দরদ দিয়ে লিখেছেন, ততটাই দরদ দিয়ে সেই বিখ্যাত কবিতা গানে তুলে এনেছেন মৌসুমী ভৌমিক। সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। কিন্তু পৃথিবীর কোনো কাব্যের, ভাষার; এমনকি ক্যামেরার সাধ্য নেই শরণার্থীর জীবনের সত্যিকারের কষ্ট, নিজের শেকড়-সংসার ছিঁড়ে অনিশ্চয়তার দিকে পা বাড়ানোর হাহাকার, শরণার্থীর জীবন বেছে নেওয়ার অপমানের কথা তুলে আনে।

শরণার্থীর নিজের ভাষা ও ভাষ্য তাই হতে পারে বড় উপায়। রংপুর জিলা স্কুলের প্রয়াত শিক্ষক নির্মলচন্দ্র লাহিড়ী আমাদের কিছুটা আঁচ দিতে পারেন সে সময়টার। একাত্তরের যুদ্ধের আঁচ শুরু থেকেই লেগেছিল রংপুরে। সে সময় এপ্রিলে পরিবারসহ নির্মলচন্দ্র কোচবিহার হয়ে কলকাতায় গিয়ে আশ্রয় নেন। নির্মলচন্দ্রের ছিল ডায়েরি লেখার অভ্যাস। সারা জীবনে ১২টির মতো ডায়েরি লিখেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকল মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দিনলিপি। এপ্রিল থেকে শুরু করে জুলাই পর্যন্ত ডায়েরি লিখেছেন তিনি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ডায়েরি লেখা নিয়মিত ছিল। প্রতিটা দিনের ঘটনার বড় বর্ণনাও থাকত। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, ডায়েরি লেখা ও প্রতিদিনের বর্ণনা তত সংক্ষিপ্ত হয়েছে। জুলাইয়ের পর আর লেখেনইনি। তবে যুদ্ধ শেষে আবার দেশে ফিরে এসেছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের হেডপণ্ডিত হিসেবে। ২০০৫ সালের নভেম্বরে ৮৬ বছর বয়সে মারা যান নির্মলচন্দ্র।

পরিবারের বাকি সদস্যদের আগেই কোচবিহার পাঠিয়ে দিয়ে পরে গেছেন পরিবারের প্রধান কর্তা। ১৯৭১ সালের গল্পটা ছিল এমনই। নির্মলচন্দ্রের ২ এপ্রিলের লেখায় এই ছবিটা উঠে আসে, ‘সকালে উঠে টাউন ছেড়ে ব্রাহ্মণীকুণ্ডা, ১৬ মাইল দূরে, রওনা হলাম। শুধু নিজের পরনের জামাকাপড় নিয়ে। জিপ, সেও দুষ্প্রাপ্য। কোনো রকমে একটা ভাঙা জিপে করে রওনা দিলাম ১৩০ টাকা খরচ করে। দুদিন আগে ফ্যামিলি পাঠানো হলো ৭০ টাকা খরচ করে। বেলা প্রায় ২টায় সেখানে পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ২৫ মার্চের পর এই প্রথম সেদিন ঘুমিয়ে রাত কাটালাম নিশ্চিন্তে। খাওয়া এবং ঘুম, দুটোই দুর্বহ হয়েছিল ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে।’

সে সময় শরণার্থীদের কীভাবে বরণ করে নিয়েছিল ওই বাংলার মানুষ, সেটিও বোঝা যাবে এদিন তাঁর লেখা থেকে, ‘আমার সঙ্গে আরও দুটো ফ্যামিলি গেল। আমরা তিন ফ্যামিলি একই জায়গায় দিন অতিবাহিত করলাম। গৃহস্বামীর এর জন্য যথেষ্ট কষ্ট হয়েছে এবং অর্থব্যয়ও হয়েছে। তথাপি তারা এতটুকু বিরক্তি বোধ করেননি। অন্তরে হলেও বাইরে প্রকাশ পায়নি।’

অনিশ্চয়তামাখা দিনের শঙ্কায় কাতর হয়ে ওঠা একজন বাবার আকুতি ধরা পড়বে পরের লাইনগুলোতে, ‘আমার দুর্দিন শুরু হলো আজ থেকে। দু মুঠো খেয়ে বাঁচতে চেষ্টা করেও জীবনহানির আশঙ্কায় অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ালাম। জানি না ভগবান আমাদেরকে কোথায় ঠেলবেন। বিরাট ফ্যামিলি, অর্থসংকট, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এইগুলি সামনে রেখেই যাত্রা করলাম। ব্রাহ্মণীকুণ্ডার লোকজন আমাদের দুর্গতি লক্ষ করে যথেষ্ট সহানুভূতি দেখিয়েছেন। তারা যে অবস্থার লোক তাতে তিনটা ফ্যামিলির ভার অম্লান বদনেই গ্রহণ করলেন। ক্ষমতা অনুযায়ী তারা আমাদের যথেষ্ট সেবা করেছেন। কখনই তাদেরকে ভুলব না। তারা আমাদের নমস্য। আমরা সেই সব সেবাধর্মীদের কাছে চিরঋণী।’

১৮ এপ্রিলে নির্মলচন্দ্র লিখেছেন ফেলে আসা বাড়ি থেকে যদি কিছু নিয়ে আসা যায় বা বাঁচানো যায়, সেই চেষ্টার কথা। কানাই নামের একজনকে তিনি পাঠিয়েছিলেন রংপুরে তাঁর বাড়িতে। কানাই না ফেরা পর্যন্ত ছিলেন দুশ্চিন্তায়, ‘…কারণ হিন্দু হলে এবং military jeep-এর সামনে পড়লে নিষ্কৃতি নেই। এই অবস্থায় কানাই ফিরে না আসা পর্যন্ত দুঃশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। রাত ৭টার পর কানাই টাউন থেকে এল। কিন্তু বাসায় যেয়ে একটা ট্রাঙ্ক ও একটা বিছানা আনতে সক্ষম হয়েছে। আর সব লুট হয়ে গেছে।’

যাত্রাপথ কতটা কঠিন ছিল, তা বোঝা যাবে ১৯ এপ্রিলের লেখা এক বাক্যের এই দিনলিপিতে, যে বাক্যটা আর শেষই করা হয়নি তাঁর, ‌‘আজ বেলা ১০টায় পাঁচখানা গরুগাড়ি করে আমরা দুটো ফ্যামিলি…।’ ১৭ মের লেখায় মিলবে আরও কিছু বর্ণনা, ‘বারাসত থেকে পৌনে ৯টায় (সকাল) রওনা হয়ে শিয়ালদহ এলাম। ট্রেন ১২/৫০-এ। দার্জিলিং ট্রেন, অসম্ভব ভিড়। ভবতোষবাবু অনেক চেষ্টা করে এক টাকা দিয়ে একটা সিট জোগাড় করলেন। ট্রেনে চেপে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠল। একজন মহিলা গরমে থাকতে না পেরে নেমে গেলেন। ভবতোষবাবু বুদ্ধি করে একখানা পাখা কিনে দিয়েছিলেন, তাই অনেক উপকারে এসেছে।
‘এদিকে সবাইকে ছেড়ে অনির্দিষ্টের পথে পা বাড়ালাম। ট্রেন ছাড়ল। আকাশ-পাতাল ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। তারপর এই বয়সে কতটা সাফল্য লাভ করব কে জানে। পরপর একটা স্টেশন ছাড়ছে। মনে হলো আমার দ্বারা কিছু হবে না। আমি ফিরে যাই। বর্ধমান যখন এলাম, তখনো ভাবলাম, না, এখান থেকেই নেমে যাই। হার্ট অত্যন্ত দুর্বল থাকায় যতবারই বাসার কথা ভাবছি ততবারই শরীর ঘেমে যাচ্ছে, মনে হলো দম আটকে যাবে এবার। কেবলই ইস্টগুরুর চিন্তা করতে করতে এপারে এলাম। ভবতোষের দেওয়া পাখাখানা স্টিমারের ভিড়ে হারিয়ে গেল। দু রাত ছিল এবং যে কামরায় খাজুরিয়া এসে উঠলাম তাতে ফ্যান ছিল, তাই বাঁচলাম। বোর্ডার স্লিপ ছাড়া কোনো টিকিট ছিল না। সারা রাস্তায় মানসিক অশান্তি এত প্রবল যে, কোনোমতেই নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। এমনকি হাত-পা অবশ। ঘন ঘন নিঃশ্বাস, মনে হলো এখানেই বোধ হয় শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে হবে। ঘাট পারাপারে কোন কুলি নেইনি। ওপারে কুলি ২ টাকা লেগেছিল।’

শরণার্থীর জীবনযাপনের চিত্র কিছুটা উঠে এসেছে পরের লেখাগুলোয়। যেমন ১৯ মে লিখেছেন, ‘রাতের আহারের চিঁড়া-কলার ব্যবস্থা হলো। অপরিচিত জায়গা, সে জন্য অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম এল না। ছেঁড়া মশারি চৌকিও ছোট। মশা বেশ উত্পাত করেছে। অনেক পড়ে ঘুমালাম।’ পরদিন, ২০ মে লিখেছেন, ‘আজ সকালে স্নানাহ্নিক সেরে বেরিয়ে পড়লুম। দুপুরে কি করব। হাঁড়ি কিনলাম। চাল, আলু, পটল কিনলাম। বেলা ১১টায় রোদের মধ্যে হেঁটে হোস্টেলে ফিরলাম। তারপর রান্না করে খেলাম। রাতের আহার চিঁড়া-কলা-চিনি।’ ২১ মে লিখেছেন, ‘সকালে মন ভালো না থাকায় আর বের হলাম না। আজ পর্যন্ত খরচ হয়েছে, কিন্তু একটা পয়সাও রোজগার করতে পারছি না। যারা আশা দিয়েছিল তাদের কোনো সাড়া নেই। কিছুই পাচ্ছি না, তবু পয়সা খরচ হচ্ছে। আধকিলো চাল আমার তিন দিন যায়। বিকেলের আহার চিঁড়া।’

জুলাইয়ের আগেই সঞ্চিত সব টাকা সম্ভব শেষ হয়ে গিয়েছিল নির্মলচন্দ্রের। এরপর থেকে ডায়েরি লেখেননি, কিংবা লেখার মতো মানসিক জোর ছিল না। যা কিছু বা যতটুকু লিখেছেন, সবই কার কাছে কত ধার করলেন আর কত খরচ হলো তার হিসাব। বোঝা যাচ্ছিল, প্রতিটা পয়সা হিসাব কষে খরচ করতে হয়েছে। ধারের হিসাবও রেখেছেন যেন ঠিক সময়ে ফেরত দিতে পারেন। বাকি সময়ের বর্ণনা আর নেই ডায়েরিতে।
কিন্তু সময়ের ফলে হলদেটে হয়ে যাওয়া ডায়েরির শূন্য পৃষ্ঠাগুলোই যেন অনেক কথা বলছে।

মুক্তিযুদ্ধের আত্মদান ও বীরত্বের গল্পে শরণার্থীদের অংশটা কেন জানি খুব বেশি উঠে আসে না। নিজ হাতে বোনা লাউয়ের মাচাটা ফেলে যে গৃহিণী ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছেন কেবল অনিশ্চয়তাকে মুঠোয় নিয়ে; তাঁর ও তাঁর পরিবারের গল্প আমাদের বারবার বলতে হবে। বিশেষ করে এই সময়ে, যখন মানুষের তৈরি মানচিত্রের কাঁটাতার পেরিয়ে অজস্র মানুষের ঢল নেমেছে বাংলাদেশের উপকূলে।

রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু/ পেটগুলো সব ফুলেফেঁপে ওঠে/ এইটুকু শিশু এত বড় চোখ/ দিশেহারা মা কার কাছে ছোটে…
কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা/ কাকে বলি কর কর কর ত্রাণ/ কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও/ মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ…
কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল/ তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা/ জননীর কোলে আধপেটা শিশু/ এ কেমন বাঁচা, বেঁচে মরে থাকা…
(ডায়েরির বানানরীতি অবিকল রাখা হয়েছে। কিছু অংশ সংক্ষেপিত।)

Share Button


আজকের বার্তা

আগরপুর রোড, বরিশাল সদর-৮২০০

বার্তা বিভাগ : ০৪৩১-৬৩৯৫৪(১০৫)
ফোনঃ ০১৯১৬৫৮২৩৩৯ , ০১৬১১৫৩২৩৮১
ই-মেলঃ ajkerbarta@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ
Site Map
Show site map

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রকাশকঃ কাজী মেহেরুন্নেসা বেগম
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠাতাঃ কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল
Website Design and Developed by
logo

আজকের বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।